রামগড় প্রতিনিধি ॥
১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত শতবছরের ঐতিহ্যবাহী রামগড় তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন দেবালয় শ্রীশ্রী দক্ষিণেশ্বরী কালী বাড়িতে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় ষোড়শ প্রহরব্যাপী মহোৎসব ও নাম সংকীর্তন উদযাপিত হয়েছে। গত বুধবার রাত আটটায় অধিবাস কীর্তনের মাধ্যমে উৎসব ও বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা এবং মঙ্গল ঘট স্থাপন করে সূচনা হয় হরি নাম সংর্কীতনের। এখানে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত মৃদুল চক্রবর্তী, হরিসাধন বৈষ্ণব, হারাধন দেবনাথ, অরবিন্দ দেবনাথ, বিষ্ণু দত্ত, স্বপন পোদ্দার, বাবুল ঘোষ ও বিমল পাল প্রদীপ।
বৃহস্পতিবার দিবাগত ভোর ছয়টায় ষোড়শ প্রহরব্যাপী হরি নাম সংকীর্তন ও তারকব্রহ্ম মহানামযজ্ঞানুষ্ঠান শুভারম্ভ হয়। শনিবার ভোর ৬টায় দধিভান্ড ভঞ্জন, মহানাম সংকীর্তনের পূর্ণাহুতি ও নগরর্কীতন দিয়ে সম্পন্ন হয় চার দিনব্যাপী এই মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান। শ্রীশ্রী বৈষ্ণব পরিচালনা করে মাঙ্গলিক কার্যক্রম সম্পন্ন করেন ভারতের ত্রিপুরা আগরতলা থেকে আগত শ্যাম সুন্দর গোস্বামী। দূর-দুরান্ত থেকে আগত পাহাড়ি-বাঙালি হাজারো ভক্তের উপস্থিতিতে কীর্তনীয়া দল শ্রীশ্রী বীণাপানি সম্প্রদায়, শ্রীশ্রী শ্রীবাস আঙ্গিনা সম্প্রদায়, শ্রীশ্রী শ্যাম সুন্দর সম্প্রদায়, শ্রীশ্রী অষ্টগোপী সম্প্রদায় ও শ্রীশ্রী দিনকৃষ্ণ সম্প্রদায় “হরে কৃষ্ণ হরে রাম” ষোল নাম বত্রিশ অক্ষর নৃত্য-গীত পরিবেশন করেন। কীর্তনীয়া দলগুলো রঙিন ও বাহারি পোশাকে সজ্জিত হয়ে নামসুধা পরিবেশন করেন। এ সময় বিশ্বের সকল জীবের শান্তি, মঙ্গল ও কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করা হয়। সনাতন সম্প্রদায়ের ভক্তবৃন্দ ব্যাপক উৎসাহউদ্দীপনায় ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। কীর্তনীয়া দল পরিচালনায় ছিলেন, আনন্দমোহন খোকন, লিটনদাশ,কৃষ্ণ দে ও সুমন দেবনাথ ভক্তবৃন্দ।

বৃহস্পতিবার রাতের অন্ন প্রসাদের স্পন্সর ছিলেন, রামগড় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদীপ কুমার কারবারী। শুক্রবার মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে রাজভোগ ও মহাপ্রসাদ আস্বাদনের ব্যবস্থা করা হয়। মহাপ্রসাদ বিতরণে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন, সুনীল দেবনাথ, প্রমোদ বিহারি নাথ, সাধন চন্দ্র দে, অসীম পাল, পলাশ দেব নাথ, ডা. বিজয় মজুমদার, ডা. শংকর দেব নাথ, জয়ন্ত দেবনাথ, কৃষ্ণ কান্ত নাগ, রুমন কান্তি নাথ, শ্যামল দাশ, প্রবীর মজুমদার, দীপঙ্কর মজুমদার আকাশ প্রমুখ। মহোৎসব উপলক্ষে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলার ও পাশের ফটিকছড়িরদূরদুরান্ত থেকে বহু ভক্তবৃন্দের আগমনে মহামিলন মেলায় পরিনত হয় রামগড় শ্রীশ্রীদক্ষিণেশ্বরী কালি মন্দির প্রাঙ্গন। মহোৎসবে বসে গ্রামবাংলারলোকজ মেলা। প্রচুর দর্শনার্থীরভীড়ে প্রত্যেকটি মেলা স্টল ছিল লোকে লোকারন্য। স্টলগুলো থেকে পূন্যার্থীবৃন্দ ধর্মীয় নানা উপকরণ সংগ্রহ করেন । আর্ন্তজাতিককৃষ্ণভাবনাবৃত সংঘের (ইসকন) একটি স্টল ঘিরেপূন্যার্থীবৃন্দের ব্যাপক উৎসাহ ও ধর্মীয় নানা উপকরণ কিনতে দেখা যায়। অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে ছিলেন, অজিত দেব নাথ, যুগেশ ত্রিপুরা, হরেন্দ্র ভৌমিক, তাজু দে, লিংকন চৌধুরী,অনিক দাশ, নন্দলাল সাহা, বাসুদেব কর।
এই মহতি অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি পাবর্ত্য জেলার সংসদ সদস্য ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত টাস্ক ফোর্স চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী পদ মর্যাদা) কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব গোপাল চন্দ্র দাশ, রামগড় বিজিবি জোন কমান্ডার লে.কর্নেল হাফিজুর রহমান, পৌর মেয়র রফিকুল আলম কামাল, উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি মো. মোস্তফাহোসেনসহ উপজেলা নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন মন্দির কমিটি ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হয়ে ভক্তবৃন্দের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মহোৎসব পরিচালনা কমিটির সভাপতি বিশ্বপ্রদীপ কুমার কারবারি ও সাধারন সম্পাদক শুভাশিষ দাশ সুন্দর-সুষ্ঠুভাবে ও কৃষ্ণ ভক্তিতে পূর্ণতা দানের মাধ্যমে সফলতা দেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সনাতন সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৩২৭ বাংলা, ১৯২০ ইংরেজি কোন এক শুভদিনে শ্রী যতীন্দ্র মোহন চক্রবর্তী মন্দিরে কালী মা’য়ের পূজা শুরু করেন। ১৯২৫ ইংরেজি ১৩৩২ বাংলায় প্রথম এখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ’৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মন্দিরটি সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। স্বাধীনতা উত্তর বিশিষ্ট সমাজ সেবক ধনঞ্জয় চন্দ্র সিংহ মন্দির পুন:নিমার্ণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তিনি ছিলেন, শ্রীশ্রী দক্ষিণেশ্বরী কালী বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তাঁর অকাল প্রয়াণে মন্দিরের হাল ধরেন যথাক্রমে ক্ষীরেন্দ্র লাল দে, যতীন্দ্র মোহন নাথ, শ্রীদাম চন্দ্র সাহা, উত্তম কুমার সরকার মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। তাঁরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন মেয়াদে মন্দিরের সাধারন সম্পাদক’র দায়িত্ব পালন করেন। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার এটি অন্যতম প্রাচীন মন্দির। এই মন্দিরকে ঘিরেঅত্রাঞ্চলের সনাতন সম্প্রদায়ের বিশাল জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুরাগ ও ভাবাবেগ জড়িয়ে রয়েছে অনাদিকাল থেকে।
