ভোট গ্রহণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই হিসেব-নিকেষ নানা জটিলতর হচ্ছে। সারাদেশে দুই বড় দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হলেও রাঙামাটির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি প্রার্থীর সাথে আছে আঞ্চলিক দল জেএসএস সমর্থিত প্রার্থীও। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর নির্ভার জয় হলেও রাঙামাটিতে সেই হিসেব ছিল উল্টো। সরকারের মন্ত্রী পরিষদে থাকা পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারকে পরাজিত করে জেএসএস সমর্থিত প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার। আর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের হেভিওয়েট প্রার্থী দীপংকর তালুকদারকে পরাজিত করেছিলেন বিএনপি প্রার্থী মনি স্বপন দেওয়ান।
কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই হিসেব কিছুটা জটিল হয়ে পড়ে। বিএনপিতে মনি স্বপন দেওয়ান প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে ভোটের হিসেবে মোড় ঘুরে। জেলায় স্পষ্টত দুই গ্রুপে বিভক্ত বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করে আসনটিতে জিততে বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য প্রার্থী হিসেবে দলটির হাইকমান্ড বেছে নেয় মণি স্বপন দেওয়ানকে। মনি স্বপন প্রার্থী হলে জেএসএস’র সাথে গোপন সমঝোতাও হবে বলে নানা কথা শোনা যায়। অপরদিকে জেএসএস’র মুল টার্গেটই হচ্ছে ‘দীপংকর ঠেকাও’। দৃশ্যত এসব কারণে মনি স্বপন দেওয়ান প্রার্থী হওয়াতে বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে প্রানচাঞ্চল্য ও আশার সঞ্চার হয়েছিল। সেজন্য প্রতীক বরাদ্দের পরপরই জোরেসোরে মাঠে প্রচারণায় নামে দলটি। চষে বেড়ান জেলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। অনলাইন-অফলাইনে সরব বিএনপি’র নেতাকর্মী সমর্থকরা। দিনের বেলায় প্রচার-প্রচারনা শেষে সন্ধ্যা থেকেই সবাই ভীড় করে দলীয় কার্যালয়ে। নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে মধ্যরাত অব্দি সরগরম থাকতো দলীয় অফিস। কিন্ত তিন চারদিন ধরে হঠাৎ করেই দলীয় অফিসে আনাগোনা কমে যায় নেতাকর্মীদের। প্রচারণায় নেমে আসে ভাটা। ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপি’র একাধিক নেতাকর্মীর সাথে কথা বলে জানা যায় নিজেদের হতাশার কথা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীই বলেন, যে আশায় মণি স্বপনের আগমনে তারা উচ্ছ্বসিত ও আশান্বিত হয়েছিল; ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসতে থাকে সেই আশা ততই মরিচিকার মত হতে থাকে। এতদিন লোকমুখে শোনা গিয়েছিল মনি স্বপনের সাথে গোপন সমঝোতা হবে জেএসএস’র। জেএসএস’র একটি অংশ গোপনে ধানের শীষেই ভোট দিবে। ভাগে আসবে ইউপিডিএফও। কিন্তু জেএসএস প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার প্রচারনা শুরুর পর ইউপিডিএফও নীরবে তার পক্ষে কাজ করে চলেছে। তারপরেও জেএসএস’র একটি অংশের ভোট পাওয়ার আশা ছাড়েনি বিএনপি প্রার্থী। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা আর আশা-আকাক্সক্ষাকে গুড়ে বালি করে দেয় জেএসএস সমর্থিত প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার। বুধবার জেলা শহরে নির্বাচনী সমাবেশে ঊষাতন তালুকদার স্পষ্টই বলেন, ‘জেএসএস কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেয়ার প্রশ্নই আসেনা। লোকমুখে শোনা যাচ্ছে একটি দলকে সমর্থন দিয়ে কিংবা ভোট ব্যাংকের বড় একটি অংশ ওই দলকে সিল মারবে। এটি ¯্রফে দিবাস্বপ্ন।’ গত তিন চারদিন ধরেই যেখানেই যাচ্ছেন এসব কথা তিনি বলে বেড়াচ্ছেন। ফলে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের আশা-আকাক্সক্ষায়ও ছিড় ধরতে থাকে।
ঊষাতনের এমন বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই স্পষ্ট হয়ে পড়ে জয়ের ব্যাপারে তারা কতটুকু মরিয়া হয়ে কাজ করছে। ফলে নিজেদের ভোট ব্যাংককে শতভাগ কাজে লাগাতে দিনরাত পরিশ্রম করছে নেতাকর্মীরা। সাথে জন্মশত্রু ইউপিডিএফও নীরবে আছে এমনটাই শোনা যায়।
অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী দীপংকর তালুকদারও জেলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত বিরামহীন প্রচারনায় ব্যস্ত সময় পার করছে। দলটির অন্তর্কোন্দল প্রকাশ্য না হলেও নানাভাবে দীপংকরের বিরুদ্ধে দলটির অনেক নেতার অবস্থান আছে বলে গুঞ্জন শোনা যায়। তবে দলটির সব স্তরের নেতাকর্মীই প্রকাশ্যে একবাক্যে দীপংকরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ বলে সরব প্রচারনায় দেখা যায়। অবশ্য দলটির কিছু কিছু নেতাকর্মীর অবমূল্যায়ন বা সুবিধে না পাওয়ায় অভিমানও রয়েছে। সেই হিসেবে তারা ভোটের মাঠে কাজ করবেন না-এমনটা কিছুদিন আগেও শোনাও গিয়েছিল। দিন গড়ার সাথে সাথে সব গুঞ্জনও যেনো হাওয়াই মিশে যেতে থাকে। অপরদিকে ক্ষোভ আর অভিমানে চুপসে থাকা নেতাকর্মীরাও নেমে আসে প্রচারণার মাঠে। দলটির সব অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা যে যেভাবে পারছেন জোর প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিনই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ওয়ার্ড-ইউনিটসহ সবখানে। প্রচারনা ক্যাম্পগুলোও সন্ধ্যার পরে মুখর হয়ে উঠে নেতাকর্মী সমর্থকদের উপস্থিতিতে। রাতদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে জোর প্রচার-প্রচারণা। জেএসএস (এমএনলারমা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) প্রকাশ্যে নৌকার প্রার্থীকে সমর্থন না দিলেও গোপনে তারাও নৌকার পক্ষে কাজ করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। ফলে নৌকার পাল্লাও ভারি হচ্ছে স্বাভাবিক।
হতাশায় বিএনপি প্রার্থীর প্রচারণা চুপসে যাওয়া, জেএসএস প্রার্থীর আপোস উড়িয়ে দেয়া আর আওয়ামীলীগ প্রার্থীর পক্ষে জোর প্রচার-প্রচারণায় বলে দিচ্ছে লড়াই ত্রিমুখী নয়; লড়াই হবে দ্বিমুখী।
