কী অবাক কান্ড,একটা শহরের একমাত্র গণপরিবহনটির শত শত গাড়ির নাম্বার নেই,নাম্বার প্লেট নেই,দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ নতুন নাম্বার নিবন্ধনও,শহরজুড়ে যেখানে পাঁচশত গাড়ি হলেই যথেষ্ট সেখানে গাড়ি চলছে দেড় হাজার,যা স্বাভাবিকের চেয়েও তিনগুণ বেশি,চালকদের আয় নেই,মালিকের জমা দিতে হিমশিম অবস্থা, তবুও কারো কোন চিন্তাই নেই। অথচ দিনমান,মাসজুড়ে কষ্ট পোহাগে হইছে শহরবাসি,সাধারন চালক-মালিক,এমনকি আইনশৃংখলাবাহিনীকেও। তবুও কেনো মিলছে না সমাধান জানেনা কেউই !
১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের দশবছর আগে প্রমত্তা কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হলে অস্বাভাবিক বাড়তি পানিতে তলিয়ে যায় পুরো রাঙামাটি শহর। ডুবে যাওয়া শহরের মানুষ এদিক সেদিক দিগি¦দিক ছুটে গেছে বাঁচার তাগিদে,কেউ বাঘাইছড়ি,কেউ মহালছড়ি,কেউ পানছড়ি,আর কেউবা শহরের পাশের উঁচু পাহাড়ে ঠাঁই নিয়েছে,সেইসব উঁচু পাহাড়গুলোর সংযোগই এখনকার রাঙামাটি শহর। নতুন সৃষ্ট সেই শহরে উঁচু নীচু পাহাড়ী পথ আর একটু পর পর বাঁক,ফলে সারাদেশের মতো এই শহরে যান হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়নি পা-চালিত রিকশা। বরং অটোরিক্সা বা টেক্সি’ই হয়ে উঠেছে শহরবাসির একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। সেই থেকে দেশের একমাত্র রিকশাবিহীন এই শহরে অটোরিক্সা দিনযাপনে চলাচলের সঙ্গী হয়ে আছে শহরবাসির। প্রথমে হলুদ টু-স্ট্রোক,পরে সবুজ ফোরস্টোক এসব যানকে শহরবাসি টেক্সী,সিএনজি,অটোরিক্সা নানান নামেই ডাকেন,এর চালকরাও বেশিরভাগই শহরের মানুষ এবং ছোট্ট এই শহরে চালক কিংবা যাত্রী,সবাই কমবেশি চেনাই ছিলো। ফলে এখানে চালক-যাত্রী বৈরিতা খুব বেশি মাত্রা অতিক্রম করেনি কখনই। একসময় তুচ্ছ তুচ্ছ কারণে টেক্সি চলাচল বন্ধ করে প্রবণতারও আগের চেয়ে অনেক কম। ভাড়াও নিয়ন্ত্রনহীন নয় তেমন একটা।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন টেক্সি রেজিস্ট্রেশন বন্ধ আছে। এই বন্ধ থাকার সুযোগে শহরে বেড়েছে কয়েকগুণ টেক্সি,যাদের নাম্বার নেই। যেহেতু নাম্বার নেই,সেহেতু এসব গাড়ির চালকদেরও কারো কাছে দায়বদ্ধতা নেই। অনটেস্ট এসব গাড়ির বেশিরভাগের চালকই সমিতির সদস্য নয়,অনেকে শুধু চালক,মালিক অন্য কেউ। রেজিস্ট্রেশন ও আইন মানার বাধ্যবাধকতা না থাকায় শহরজুড়ে অনটেস্ট গাড়ির দাপুটে পথচলায় অস্বস্থি পুরো শহরে। এসব গাড়ির কোন নাম্বার না থাকায় কোন দূর্ঘটনা ঘটলে বা অপরাধে জড়িত থাকলেও গাড়ি শনাক্ত করতে পারছে না আইনশৃংখলাবাহিনী। ফলে বিপাকে ও ঝুঁকিতে পড়েছে শহরের আইনশৃংখলাও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে,শহরে এখন বৈধ টেক্সির সংখ্যা বড়জোর সাতশত,যার মধ্যে অন্তত তিনশতই চলাচলের স্বাভাবিক সক্ষমতা হারিয়েছে,লক্কর ঝক্করভাবে তবুও চলছে। আর এর বাইরে অনটেস্ট গাড়ী চলছে অন্তত দেড় হাজার ! এর সব গাড়িই যে নতুন তা কিন্তু নয়। রাঙামাটি থেকে বিভিন্ন সড়কে ও উপজেলায় চলাচলকারি গাড়িগুলোকেও রঙ করে এনে অনটেস্ট লিখে চালানো হচ্ছে শহরে। শহরে মাত্রাতিরিক্ত অটোরিক্সা চলাচলের কারণে প্রায়শই যানজটও লেগে থাকছে,বাড়ছে দূর্ঘটনাও।
এনিয়ে ক্ষুদ্ধ চালকরাও। ক্ষুদ্ধ চালকদের ক্ষোভের বলি হয়ে পদ হারিয়েছেন সমিতির বিগত কমিটির প্রায় সব নেতাই। নতুন নির্বাচনে নতুন নেতৃত্ব বেছে নিয়েছেন চালকরা,যদিও সেই নতুন কমিটি এখনো দায়িত্ব বুঝে নিতে পারেনি। এনিয়ে দ্বিধায় আছে নতুন কমিটির নেতারাও।
দীর্ঘ ত্রিশবছর ধরে রাঙামাটি শহরে টেক্সি চালান কাশেম। তিনি বলেন, ‘গত ৩০ বছরে এমন কষ্টে ছিলামনা কোনদিন। সকাল থেকে রাত অবধি গাড়ি চালিয়েও জমা তুলতে কষ্ট হয়,সংসার চালাব কি করে। একদিকে কোভিডের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির যন্ত্রনা,অন্যদিকে অনটেস্ট গাড়ির যন্ত্রনা ! কি করব জানিনা।’
এই বিষয়ে নবনির্বাচিত সাধারন সম্পাদক মিজানুর রহমান বাবু বলছেন, আমাদের বৈধ গাড়ি আছে সাতশত,অনটেস্ট গাড়ির কোন সংখ্যা জানা নাই। তবে ২১৪ টি গাড়ী দুই বছর আগে রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করেছে বলে শুনেছি। এখন শত শত অনটেস্ট গাড়ি। আবেদন নেয়াও বন্ধ। আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর মালিক-চালকরা একসাথে মিলে প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে সংকটটি সমাধান করার চেষ্টা করব। আশা করছি,রাঙামাটির বাস্তবতা সবাই বুঝবে।’
বাবু বলেন- অনটেস্ট গাড়ির কারণে প্রচুর সমস্যা হচ্ছে। এর চালকরা বেশিরভাগই আমাদের সদস্য না,তবে অনেক সদস্যও আছেন। আমরা চালকদের স্বার্থ বিবেচনায় নেয়ার পাশাপাশি শহরের সৌন্দর্য্য যেনো নষ্ট না হয়,শহরে ঠিক যে পরিমাণ গাড়ি চললে সবার সুবিধা হয়,সেই পরিমাণ গাড়ির অনুমতি দিলেই আমাদের আর বলার কিছু থাকবে না। আমাদের চালকদের আয় কমে গেছে,খুব কষ্টে আছেন তারা।’
অটোরিক্সা চালক সমিতির এই নেতা,অনটেস্ট গাড়ীর সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসন এবং বিআরটিসি’র আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন। তবে জেলা প্রশাসন পুরো বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে এর আগেই জানিয়েছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
সংবাদকর্মী ও পরিবেশবাদি সংগঠক সৈয়দ হেফাজত উল বারি সবুজ বলছেন, ‘এই রাঙামাটি শহর ঠিক যে পরিমাণ গাড়ি চলাচল ধারণ করার সামর্থ্য রাখে তারচে একটিও বেশি গাড়ি চলার প্রয়োজন নেই। শহরের সক্ষমতা এবং জনগণের প্রয়োজন দুটিকে বিবেচনায় নিয়ে একবার ঢালাওভাবে রেজিস্ট্রেশন না দিয়ে এই প্রক্রিয়াটিই নিয়মিত রাখা উচিত। পুরাতন গাড়ি তুলে নিতে হবে,নতুন গাড়ি নামাতে হবে। এটা শুধু টেক্সির বেলায় নয়, বাস-লঞ্চ এবং অন্যান্য গাড়ির বেলায়ও প্রযোজ্য করতে হবে। শহরে চলাচলকারি প্রতিটি মোটরসাইকেল-বাস-পিকআপ-মাইক্রো-কার-টেক্সিসহ সকল যানের অবশ্যই বৈধ রেজিষ্ট্রেশন থাকতে হবে এবং চালকদেরও লাইসেন্স থাকতেই হবে। নতুবা যেকোন অপরাধ বা দূর্ঘটনায় এদের চিহ্নিত করা কঠিন হবে।’
