গত ১৮মার্চ রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে হত্যাকান্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আ. মান্নান, চট্টগ্রাম পুলিশের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের আনসার কমান্ডার শামশুল আলম ।
গতকাল বুধবার পরিদর্শন শেষে বাঘাইছড়ি ২৭ বিজিবি সদর দপ্তরের মাঠে স্থানীয়দের সাথে মত বিনিময় সভা করা হয়। এসময় ঘটনার জন্য পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়, তাদের শক্তি, সামর্থ্য জানান দেয়ার জন্যই এ ধরনের হামলা, যা রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ঘোষনার শামিল। কঠোর হস্তে সন্ত্রাস দমন করা হবে বলেও ঘোষণা করেন কর্মকর্তারা।
এরিয়া কমান্ডার পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের জানান, নিরপরাধ কেউ যেন হয়রারির শিকার না হয় সে জন্য কম্বিং অপারেশনে যৌথবাহিনী সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। সন্ত্রাসীরা সকলকেই মারতে পারে। সেদিনের ঘটনায় চাকমা, মুসলিম এবং হিন্দু নিহত হয়েছে, কিন্তু আইনশৃংখলা বাহিনী নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করতে পারেনা। তাই দোষীদের গ্রেফতারে সময় লাগছে। তবে প্রকৃত সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করে তারা যেখানেই থাকুকনা কেন সেখানেই অভিযান চালিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কম্বিং অপারেশন প্রথমত ২৫ মার্চ পর্যন্ত হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা ২৯ মার্চ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। আর এ কম্বিং অপারেশনরে কারণে এ অঞ্চল থেকে সন্ত্রাসীরা বিতাড়িত হবে; এ অঞ্চল হবে সন্ত্রাসমুক্ত। এরিয়া কমান্ডার প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর শান্তিবাহিনী অস্ত্র জমা দিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী পাহাড় থেকে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন দূর্গম অঞ্চল থেকে ২৪০টি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাহলে কেন আঞ্চলিক সংগঠনের নামে অস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসের মাধ্যমে চাঁদাবাজি, কেনো হত্যাকান্ড ঘটানো। এভাবেতো শান্তি চুক্তিকে ভন্ডুল করা হচ্ছে। সরকার দুর্বল নয়, সরকারের বাহিনীও দূর্বল নয়। শুধু সাধারন মানুষের মাঝে শান্তি টিকিয়ে রাখতে সরকার ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। এভাবে ধৈর্য্যরে সীমা অতিক্রম হয়ে যাচ্ছে। যারা চুক্তি ভন্ডুল করছে, তাদের কঠিন খেসারত দিতে হবে।’
বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজির অর্থ আদায়ের জন্য এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দলের বিভক্তি, নেতৃত্বের বিরোধ আর নিজেদের শক্তি জানান দেওয়ার জন্যই এ হত্যাকান্ড। এ হত্যাকান্ডে আঞ্চলিক সংগঠন জড়িত। এ ঘটনাটি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ে এ ঘটনা নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন। পাহাড় থেকে অবৈধ অস্ত্র নির্মূলে করণীয় সম্পর্কে এখন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অপেক্ষা মাত্র।’
চট্টগ্রাম পুলিশের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘নিহত সাতজনের মধ্যে চারজনই আনসার সদস্য এবং স্কুল শিক্ষকও রয়েছেন। আহত ১৯জনের মধ্যে ৫জনই পুলিশ সদস্য। সরকারী দায়িত্ব পালনের সময় এরকম হত্যাকান্ড রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। যে কোন মূল্যে অপরাধিদের গ্রেফতার করা হবে।’
অপরদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাঘাইছড়ি থানার ওসি (তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলম জানান, ঘটনার পর ৯দিনেও কেউ গ্রেফতার না হলেও প্রকৃত অপরাধীদের তালিকা করে ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো জানান, ঘটনাস্থলে পাওয়া গুলি এবং গুলির খোসা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে এসব অস্ত্র দেশে ব্যবহার হয়না। তাতে ধারণা করা হচ্ছে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত বা মিয়ানমার থেকে সংগ্রহ করা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় সাথে ছিলেন, খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক এম মামুনুর রশিদ, পুলিশ সুপার আলমগীর কবীরসহ স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাগন।
মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ৫লাখ ৫০ হাজার টাকা করে, গুরুতর আহতদের পরিবারকে ১লাখ টাকা করে এবং আহতদের ৫০হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া হতাহতদের পরিবারের ছেলেমেয়েদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরীর ব্যবস্থা করা হবে। এর বাহিরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকেও হতাহতদের অর্থীক অনুদান দেওয়ার ঘোষনা দিয়েছে। সভা শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ্য থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের হাতে নগদ ৫০ হাজার টাকা করে তোলে দেন এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান।
প্রসঙ্গত, রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে গত ১৮ই মার্চ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষ করে সাজেকের তিনটি ভোট কেন্দ্র থেকে ভোট বাক্স সহ নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্যরা ভোটগ্রহণ শেষে চারটি গাড়ীযোগে বাঘাইছড়ি ফেরার পথে নয়মাইল এলাকায় তাদের উপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
এতে দুই পোলিং অফিসার, চার আনসার সদস্য ও মন্টু চাকমা নামে অজ্ঞাত একজন নিহত হয়। এসময় আহত হন আরো অন্তত ১৯ জন।
এই ঘটনায় বাঘাইছড়ির সাজেক থানার মধ্যপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মোঃ আক্তার আলী বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৪০/৫০ জনকে আসামী করে বাঘাইছড়ি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
