নয় বছর পর নতুন নেতৃেত্ব প্রাণ ফিরে পেয়েছে রাঙামাটি জেলা ছাত্রদল। গত মঙ্গলবার (৫ মে) রাঙামাটির জেলা শাখার নতুন কমিটি ঘোষনা করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ আজমামুল হাসান এ কমিটির অনুমোদন দেন।
এতে রাঙামাটি পৌর ছাত্রদলের সভাপতি ফারুক হোসেন সাব্বিরকে সভাপতি ও রাঙামাটি পৌর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর সুমনকে জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে ঘোষনা করা হয়। প্রাথমিক ভাবে সংগঠনটির জেলা কমিটিতে ৩৩ জনের নাম প্রকাশ করা হলেও পরবর্তীতে পূর্নাঙ্গ কমিটি ঘোষনা করা হবে বলে জানিয়েছে জেলা ছাত্রদল।
এদিকে, ৩ জুন জেলা ছাত্রদলের বিদায়ী সভাপতি আবু সাদাৎ মোহাম্মদ সায়েম ও সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের তালুকদারের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় ৩ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি ঘোষনা করেন। এছাড়া একইদিনে আলাদা আলাদা বিজ্ঞপ্তিতে রাঙামাটি সদর উপজেলাসহ অন্য উপজেলাগুলোর নতুন কমিটিও ঘোষনা করেন বিদায়ী জেলা কমিটি। তবে গতকাল ( ৯মে) বিদায়ী জেলা কমিটির সভাপতি আবু সাদাৎ মোহাম্মদ সায়েম ও সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম তালুকদারের ঘোষনা করা রাঙামাটি সরকারি কলেজ, সদর উপজেলা ও অন্য উপজেলাগুলোর কমিটিগুলো স্থগিত করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।
জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষনার পর পদ প্রত্যাশী অনেকেই নব গঠিত কমিটি নিয়ে অভিযোগ তুলেছে। তারা বলছেন, সবার সাথে সমন্বয় না করে নতুন জেলা কমিটি একপক্ষীয় ভাবে করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই চাকুরিজীবী রয়েছে। তারা বলছেন, জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ আরও কয়েকজন চাকুরীজীবিও এ কমিটি স্থান পেয়েছে।
তবে বর্তমান জেলা ছাত্রদলের নেতা বলছেন, কয়েকজন ত্যাগি নেতা পদে আসতে পারেনি তা সত্য। কিন্তু পরবর্তীতে পূর্রাঙ্গ কমিটি ঘোষনা করা হলে তাদের গুরুত্ব দায়িত্বে আনা হবে।
এদিকে জেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষনার ২৪ ঘন্টার মাথায় পুর্নগঠন করা হয় জেলা যুবদলের নতুন কমিটি। জেলা যুবদলের সভাপতি সাইফুল ইসলাম শাকিলকে পুর্নবহাল রেখে জেলা ছাত্রদলের বিদায়ী সভাপতি আবু সাদাৎ মোহাম্মদ সায়েমকে আনা হয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে। ৫ সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটি সিনিয়র সভাপতি পদে মোঃ নুর নবী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নাজিম উদ্দিন ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে মোঃ ইউসুফ চৌধুরী স্থান পায়।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুৃক জেলা ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, আমরা যারা ছাত্রদল করি, তাদের অনেকেরই এই কমিটি মন মতো হয়নি। দেখা গেছে, যারা কলেজে পা রাখেনি কিংবা উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করেছে তারাও আজ গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব নিয়েছে। এর মধ্যে এই কমিটিতে বিবাহিত ও চাকুরীজীবিরাও স্থান পেয়েছে।
সদর উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহ এমরান বলেন, ‘দুর্ভাগের বিষয় জেলা বিএনপির নেতারা নিজেদের মন মতো কমিটি করে জেলা ছাত্রদলকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। এ জেলা কমিটি তৃনমূলের নেতাকর্মীদের রাজপথে নামাতে পারবে বলে আমার হয় না। মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রীক রাজনীতির কারণে জেলা ছাত্রদল আজ ত্যাগি ছাত্রনেতাদের হারাতে বসেছে।’
রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ইমরান চৌধুরী সুজন বলেন, ‘আমি নিজেও জেলা ছাত্রদলের সেক্রেটারি প্রার্থী ছিলাম; এই বিষয়ে আসলে আমাদের এখন তেমন কিছু বলারও নেই। তবে আমি মনে করি সবার সাথে যদি সমন্বয় করে নতুন জেলা কমিটি গঠন করা যেত, তাহলে বিষয়টি আরো সুন্দর দেখাতো। এখন অনেক নেতাকর্মীরাই এই কমিটি নিয়ে অভিমান করেছে। এর মধ্যে বিদায়ী জেলা কমিটি আমরা যারা দায়িত্বে আছি তাদেরকে না জানিয়ে, সাংগঠনিক বিষয় না ভেবে অগণতান্ত্রিক ভাবে কলেজ ও অন্যান্য উপজেলা গুলোর কমিটি ঘোষনা করেস। এরই প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল এ কমিটি গতকাল স্থগিত ঘোষনা করেছে।’
জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও নব গঠিত কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মোঃ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘নতুন কমিটির মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে এটা আনন্দের বিষয়। এর মধ্যে আগামী দিনের আন্দোলনে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াটাই মুখ্য বিষয়। কিন্তু এবার এমন একটা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে যেটা আমার কাছে একপক্ষীয় কমিটি হিসেবে মনে হয়েছে। যেখানে সবার সাথে সমন্বয় না করেই একপক্ষীয় ভাবে নতুন কমিটি ঘোষনা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাদের শিক্ষাগতা যোগ্যতা নেই তারাও এই কমিটির গুরুত্বপূর্ন দায়িত্বে এসেছে। এমনও হয়েছে যারা এসএসসি পাশও করেনি। কলেজেও যায়নি; তারাও গুরুত্বপূর্ন দায়িত্বে এসেছে। রাজনৈতিকভাবে এটি একপক্ষীয় কমিটি ঘোষনা করা হয়েছে। যা আমাদের কাছে গোছানো মনে হয়নি। দলের দুর্দিনে যোগ্য নের্তৃত্ব বেচে নেওয়াই আমাদের দায়িত্ব। আমি মনেকরি এভাবে চলতে থাকতে আগামীদিনে ছাত্র আন্দোলন তথা সকল আন্দোলন সংগ্রাম ঝিমিয়ে পড়বে। সামনের দিনে যদি এ কমিটিকে সমন্বয় ও পরিমার্জন করা যায় তাহলে আগামী দিনের আন্দোলন সংগ্রাম আরো বেগবান হবে’- যোগ করেন তিনি।
রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর সুমন বলেন, ‘যারা নেতৃত্বে এসেছে তারা সবাই দলের সক্রিয় কর্মী। এটা সত্য যে এ কমিটিতে দুই একজনকে ত্যাগি নেতাকর্মী আসতে পারেনি। যেহেতু তারা দায়িত্ব পায়নি, আমরা পূর্নাঙ্গ কমিটি করার সময় তাদেরকে মূল্যায়ন করবো। আমি মনে করি আগামীদিনে দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্তি ও সরকারের পতনের আন্দোলনে সবার সাথে সমন্বয় করে জেলা ছাত্রদল সামনের এগিয়ে যাবে।’
জেলা ছাত্রদলের বিদায়ী সভাপতি ও জেলা যুবদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবু সাদাৎ মোহাম্মদ সায়েম বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় থেকেই ওয়ার্ড পর্যায় থেকে ছাত্রদলের সাথে সম্পৃক্ত। আমি মনেকরি এ কমিটিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল রাজপথের কর্মীদের মূল্যায়ন করেছে। আর একটা কমিটি ঘোষনা করলে মান-অভিমান থাকবেই। তারপরও এখানে সিনিয়র-জুনিয়রের বিষয়টা মেইন্টেইন করাটা ঠিক হয়নি। আশাকরছি সামনে পূর্নাঙ্গ কমিটি ঘোষনার সময় তা পরিমার্জন করা হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই ছাত্রনেতা নেতা বলেন, আমি মনেকরি এ কমিটি আগামীদিনে দলকে চাঙ্গা রাখতে পারবে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দীপন তালুকদার (দীপু) বলেন, ‘আমি মনে করি নতুন যে জেলা কমিটি হয়েছে সেটা কেন্দ্রীয় ছাত্রদল দেখেশুনেই করেছে। একটা নতুন কমিটি করলে মান-অভিমান বাধবেই। আমরা যারা বিএনপির দায়িত্ব নিয়েছে, আমাদের পক্ষ থেকে নতুন কমিটির প্রতি সার্বিক সহযোগিতা তো থাকবেই। দীপু বলেন, দীর্ঘ দিনের পুরোনো কমিটির নেতারা যাচাই বাচাই করেই কলেজ ও অন্যান্য কমিটি গুলো গঠন করেছেন। এতে আমাদের কোনও দ্বিমত নেই। তবে কে বা কারা ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদককে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন হয়ত। যার কারণে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল জেলা ছাত্রদলের ঘোষনা করা কলেজ ও উপজেলা কমিটিগুলো স্থগিত করেছে।
