সুহৃদ সুপান্থ
দুই মেয়াদে আট বছর দায়িত্ব পালন করেছেন,নিয়ম অনুসারে তৃতীয়বার ভিসি হওয়ার কোন সুযোগই নেই,অথচ তিনি সেই চেষ্টাও করেছেন,সুপারিশে রাজি করিয়েছেন খোদ রিজেন্ট বোর্ডকেও,কিন্তু ব্যত্যয় হয়নি নিয়মের,ভাগ্যের সিঁকে ফের ছিঁড়েনি তার,ফলে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে তার অধ্যায় আপাতত শেষই হয়ে গেলো। সরকার ২৩ মার্চ বুধবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা মেধাবী শিক্ষক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়ায়, আপাতত বিদায়ই বলতে হলো তাকে। তিনি ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি। পুরো দুই মেয়াদেই কারণে বা অকারণে কাজের চেয়ে অকাজেই ব্যাপক সমালোচিত ছিলেন যিনি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্তই ব্যক্তিগত ইচ্ছায় নির্মিতব্য রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় শেখ হাসিনার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়। পাহাড়ের প্রকৃতি ও পরিবেশকে সমুন্নত রেখে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এলাকায় একটি দারুন আবহে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিভাবক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা ২০১৪ সালে প্রথম ভিসি নিয়োগ দেয় সরকার। বহু আশা ছিলো তার উপর। কিন্তু বিধিবাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণী কার্যক্রম শুরু করা থেকে শুরু করে যাবতীয় সবকাজেই তালগোল পাকিয়ে ফেলেন প্রবীন মেধাবী এই শিক্ষক। প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় শুরু থেকেই এলোমেলো কাজে জড়িয়ে যান। বিশ^বিদ্যালয়ের শ্রেণী কার্যক্রম শুরুর দীর্ঘসূত্রিতার জন্য একাধিক প্রতিবেদনে তার অবহেলা ও গাফিলতিকেই দুষেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরে শহরের একটি স্কুলের ল্যাবরেটরির দুই শ্রেণীকক্ষে বছরের পর বছর শ্রেণী কার্যক্রম চলার দায়ও তার উপরই বর্তায়।
তবে তিনি সবচে বেশি সমালোচিত হন, বিশ^বিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের নাম ফলক তুলে ফেলার পর আইনী পদক্ষেপ না নেয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি, নিয়োগে অনিয়ম ও ব্যাপক স্বজনপ্রীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রকাশনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার নাম না থাকায় তীব্র সমালোচনার মুখে প্রকাশনা প্রত্যাহার করা,শেখ হাসিনার জন্মদিন পালন করায় কিছু শোকজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরুর দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারি এক ছাত্রকে ঠুনকো অজুহাতে বহিষ্কারসহ নানা অপকর্মে ব্যাপক সমালোচিত এই ভিসি ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে মধ্যরাত অবধি অবরুদ্ধও ছিলেন ভেদভেদী একাডেমিক ক্যাম্পাসে।
তার দ্বিতীয়বার নিয়োগের আগে তার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে আন্দোলন কর্মসূচীও পালন করে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ,পার্বত্য নাগরিক পরিষদ,পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন। সবার বিরোধীতার মুখেও পাহাড়ীদের মধ্যে যোগ্য কাউকে না পাওয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের তব্দিরে ফের দ্বিতীয়মেয়াদে নিয়োগ পান বহুল বিতর্কিত এই ভিসি। এরপর শুরু করেন রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধ আর তোয়াজে নানান সুপারিশ বাস্তবায়ন ! যার ফলে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র কাঠামো। তবে নানাপক্ষের চাপের কারণে তার দ্বিতীয় মেয়াদে বেশ কিছু মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু স্থায়ী ক্যাম্পাসের পুরো অবকাঠামো দশ শতাংশও বাস্তবায়িত হতে পারেনি তার ‘ভয়,আপোষ,সমঝোতা আর সততার অভাবে’ এমন ভাষ্য স্থানীয়দের। আঞ্চলিক দলগুলোর কোন বেয়ারা কর্মীর সামান্য মোবাইল ফোনের ধমকেই যিনি ভয়ে থরথর কাঁপতেন বলে অভিযোগ তার ঘনিষ্ঠজনদেরই।
অভিযোগ ছিলো, তার নিজের একাধিক স্বজনকে চাকুরি দেয়ার,খাগড়াছড়ির একটি বিশেষ গ্রাম থেকে বেশ কয়েকজনকে নিয়োগ দেয়া,তৃতীয় শ্রেণী পাওয়া একজনকে প্রথম শ্রেণীর পদে নিয়োগ, পাহাড়ের এলিটদের আত্মীয় স্বজন পরিবারবর্গকে চাকুরি দেয়া,ভর্তিতে অনিয়ম, ভর্তি বিজ্ঞপ্তি জাতীয় পত্রিকায় না দেয়াসহ নানান অনিয়মের।
এই বছরের শুরুতেই তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক মুুহুর্তে তরিঘরি করে রিজেস্ট বোর্ডের সভা আহ্বান করেন তিনি। সভা থেকে তাকে আবারো ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ সম্বলিত প্রস্তাবনাও পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। নজিরবিহীন এই অনুরোধের ঘটনায় বিস্মিত হয় সকলেই সারাদেশের কোথাও কাউকে তৃতীয় মেয়াদে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার কোন উদাহরন না থাকলেও চেষ্টা অব্যাহত রাখেন ড. প্রদানেন্দু ‘অজ্ঞাত’ কারণে। তার বিশ্বাস ছিলো,পার্বত্য চট্টগ্রামের ইস্যু বিবেচনায় নিয়ে তাকে ফের হয়ত নিয়োগ দিবে সরকার,সেই কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিতেও অপরাগতা ছিলো তার। এমনকি শেষ মুহুর্তে রাঙামাটির এমপি’র নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের নামকরণের পেছনেও তার পুনর্নিয়োগ পাওয়ার আকাংখার প্রতিফলন দেখেছেন অনেকেই।
কিন্তু এবার আর ভাগ্যের সহায়তা পাননি ড. প্রদানেন্দু। তার স্থানীয় ‘রাজনৈতিক অভিভাবক’ কিংবা মজ্ঞুরী কমিশনের সাবেক বা বর্তমান সুহৃদরা কেউই তার জন্য কোন সুখবর দিতে পারেননি। ফলে ব্যর্থতার বৃত্তে আট বছর ধরে হাঁসফাঁস করা এক ব্যর্থ প্রশাসক বিদায় নিলেন শহরবাসির ন্যুনতম শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা না পেয়েই। শহরবাসি খুশিই তার বিদায়ে। অনেকেই উচ্ছাস প্রকাশ করে তার বিদায়কে স্বাগত জানিয়েছেন।
সময় টিভির সাংবাদিক হেফাজত সবুজ লিখেছেন -‘শাপমুক্ত হলো রাঙামাটির উচ্চ শিক্ষার আতুরঘর’।
উন্নয়নকর্মী মিন্টু মারমা লিখেছেন-‘ খুশি হলাম, বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের ঘরের বিদ্যালয় মনে করেছিলো।’
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলছেন, ‘একটা আপদ বিদায় হলো। তার বিদায়ে পথহারা বিশ্ববিদ্যালয়টি এবার সঠিক পথেই ফিরবে এবং চলবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। ড. প্রদানেন্দু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেই ক্ষতি করেছে,যে পরিমাণ ইমেজ নষ্ট করেছে তা ফিরে পেতেও সময় লাগবে।’
এমন হাজারো মানুষের প্রতিক্রিয়াই মিলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু একজন সত্যিকার শিক্ষকের বিদায়তো এমন হওয়ার কথা ছিলো নাহ্ ! ফলে যেভাবে নীরবেই একদিন ভিসির দায়িত্ব পেয়েছিলেন ঠিক একইভাবে খুব নীরবে দায়িত্ব শেষে ফিরে যেতো হলো আলোচিত -সমালোচিত- বিতর্কিত এক ভাইস চ্যান্সেলরকে,যিনি ইতিহাস হতে পারতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি হিসেবে হাজারো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতে পারতেন, তার বিদায়ে জলে ভিজতে পারত কিছু মানুষের চোখ….নাহ্, এর কিছুই হলোনা…..মূলত: তার আট বছরের কর্মই ঠিক করে রেখেছিলো নীরব অবহেলায় বিদায়ের অমোঘ নিঠুর নিয়তি ! তবে বিদায় ড. প্রদানেন্দু …
