যখন সম্মেলন ঘিরে প্রার্থীরা ব্যস্ত, যে যার মতো কাউন্সিলরদের কাছে টানতে উপজেলায় উপজেলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন, ঠিক এমন সময়ে খবর আসে ২৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন স্থগিত ! যেনো অকস্মাৎ বাজ পড়লো সবার মাথায়। দ্রুত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এ খবর। হতাশা নেমে আসে প্রার্থীদের মধ্যে। দীর্ঘ সাত বছর পর উৎসবমুখর সম্মেলন ঘিরে হঠাৎ নেমে আসে অন্ধকারের ছায়া। এমন মন খারাপ আর হতাশার মধ্যেই মঙ্গলবার বিকেলে বিষাদ হয়ে নেমে আসে ১ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও।
এদিকে সম্মেলন স্থগিতের পর মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকেই কয়েকটি ফেক ফেসবুক আইডি থেকে ইনবক্সের মাধ্যমে জনে জনে ছড়ানো হতে শুরু করে একটি ভিডিও ক্লিপ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ ভিডিও , যেখানে বর্তমান জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মুছা মাতব্বরের বিরুদ্ধে চাকরি দেয়ার কথা বলে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন মুখে কাপড় দিয়ে ঢাকা এক নারী। ভিডিওতে ওই নারী নিজেকে কাউখালির বাসিন্দা দাবি করে, বেশ কিছু অভিযোগ আনেন আওয়ামীলীগ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। তবে মেয়েটির বক্তব্যের মধ্যেই বেশ অদ্ভূত ও অবিশ্বাস্য কিছু তথ্য থাকায় শুরুতেই ভিডিওটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার দাবি করে চাকুরি খোঁজা,চাকুরির জন্য ২ লক্ষ টাকা দেয়া, কক্সবাজারে গিয়ে শরীর বিকিয়ে দেয়া এবং টাকা ফেরত চাওয়ার বক্তব্যটি শেষ দুই সেকেন্ডের মুখভঙ্গীর কারণে আরো বেশি ‘বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা’ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু তবুও অজ্ঞাত নানান ফেক আইডি থেকে ছড়ানো হতে থাকে ভিডিওটি। শুরুতে শী ুৃচমগস নামের একটি আইডি থেকে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। সেই আইডি থেকেই ছড়ানো হয় শুরুতে,পরে এটি দ্রুত ছড়ানো হয় আরো বেশ কয়েকটি ফেক আইডি থেকে। সম্মেলনে একজন বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা নেতাকর্মীরা এবং পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর নেতাকর্মীরাই এই ভিডিওটি ব্যাপকভাবে পোস্ট,শেয়ার এবং ইনবক্সে পাঠাতে দেখা গেছে বলে দাবি করেছেন মুছার একজন ঘনিষ্ঠ কর্মী। ওই কর্মীর দাবি, ‘ এই ভিডিও তৈরি করা হয়েছে কাউন্সিলের আগের দিন শেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। কিন্তু সম্মেলন স্থগিত হয়ে যাওয়ায়,তারা ( মুছার বিরোধীরা) রাগ সামলাতে না পেরে ওইদিনই এটি ছড়িয়ে দেয়া শুরু করে। আমরা প্রাথমিকভাবে কয়েকটি ফেসবুক আইডি সনাক্ত করেছি এবং আইনশৃংখলাবাহিনীকে দিয়েছি,তারা পুরো বিষয়টি দেখছেন।’
মঙ্গলবার রাতে নিজের ফেসবুক ওয়ালে ভিডিওটি শেয়ার করেন রাঙামাটির সাবেক সংরক্ষিত সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু। তার শেয়ারের পর সেখানেই তীব্র প্রতিবাদ ও আক্রোশে ফেটে পড়েন হাজী মোঃ মুছা মাতব্বর। তিনি চিনুর ওই শেয়ারের নীচেই চিনুকে চ্যালেঞ্জ করে ওই নারীকে হাজির করা না হলে মানহানির মামলা করার হুমকি দেন। জবাবে চিনু তার আগেও অনেকেই এটি শেয়ার করেছে দাবি করেন। একই স্ট্যাটাসের নীচে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেন কাপ্তাই উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুমন,সম্পাদক লিমন,সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাজীবসহ আওয়ামীলীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতারা। তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে ভিডিওটি নিজের ওয়াল থেকে শেয়ার সরিয়ে নেন জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও জেলা আওয়ামীলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক চিনু।
সম্মেলনের প্রচারনায় মুছা মাতব্বরের তীব্র বিরোধীতা করে মাঠে নামা অনেকেও এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এটিকে নোংরা রাজনীতি বলে মন্তব্য করেছেন। অনেকেই পুরো বিষয়টিকে দলীয় রাজনীতির নোংরা দিক বলেই মন্তব্য করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মুছা মাতব্বর বলেন, সম্মেলনকে সামনে রেখে আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল আমাকে হেনস্তা করার উদ্দেশ্যে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার প্রতিপক্ষের একটি অংশ আমাকে অপদস্থ করার হীন মানসিকতায় এ ধরনের কাজ করতে নেমেছে। তবে আমি এই বিষয়ে বিচলিত নই। তিনি বলেন, আমি ভিডিওটি তৈরি ও শেয়ারের জন্য সাবেক এমপি ফিরোজা বেগম চিনুকে দায়ি করছি। কোনও কারণে তাঁর আমার ওপর ক্ষোভ রয়েছে, তার জন্য তিনি এই কাজ করেছেন। আমি তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’ বুধবার তিনি আইনজীবির সাথে পরামর্শ করেছেন এবং শীঘ্রই আইনী পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কমকে।
এ বিষয়ে সাবেক সংরক্ষিত আসনের মহিলা সংসদ সদস্য ও জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সভানেত্রী ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, ভিডিওটির বিষয় নিয়ে আমি কিছুই জানি না। হঠাৎ ভিডিওটি আমার চোখে পড়ার পর আমি মুছার দৃষ্টি আর্কষণের জন্য ভিডিওটি শেয়ার দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করছে। বরঞ্চ তারাই আমাকে যেভাবে গালিগালাজ করেছে, তাতে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। তিনি বলেন, আমার আগে আরো ৩৮ জন ভিডিওটি শেয়ার করেছে, যদি আমার নামে তাঁর মামলা করতে ইচ্ছে হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করুক।
বুধবার রাতে এই রিপোর্ট লেখার সময়ও আলোচিত ‘ফেক ভিডিওটি’ ৩৬২ বার শেয়ার হয়েছে। ভিডিওটির নীচে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ পক্ষেও বলছেন। রেহনুমা খানম নামের এক নারী লিখেছেন, ‘মাইয়া তুমি তো নিজেই একটা থার্ড ক্লাস মাইয়া…চাকরির জন্য দেহ বিলাই আসছো।আবার সোশাল মিডিয়াতে ঐ গুলো এসে বলো…তোমারে তো দুঃখী ঘরের মেয়ের মত লাগেনা!!ব্রু তে এত্ত কাজল চোখে এত কাজল দিলা পুরুষ মানুষকে ইম্প্রেস করার জন্য আর বলো আমাকে জোর করসে।ফালতু মাইয়া।’ চাইথোয়াই মারমা নামের একজন লিখেছেন, ‘এতদিন চুপ ছিল কেন? আইনের আশ্রয় নেন ।’ জামাল হোসেন নামের একজন লিখেছেন, ‘এটা তদন্ত করে ব্যবস্হা নেওয়া উচিৎ। যদিও প্রশাসনকে টাকা দিয়ে এটা ধামাচাপা দিয়ে দিবে মনে হচ্ছে।’ ইকবাল মাহমুদ নামে একজন লিখেছেন, ‘সম্মেলনের আগে কেন??? এটা কিসের মতলব, হতে পারে মুছা মাতব্বর এমন কিছু করেছে, মানুষ ভূলের উর্দে নয়। কিন্তু মুছা ভাই যদি এ কাজটি করে থাকে তাহলে মুছা ভাইয়ের নেতাতো রাঙ্গামাটি জেলায় ছিল, উনাকে বিষয়টি বলার দরকার ছিল। আমার দৃষ্টিতে এটি একটি গভীর চক্রান্ত।’
এমন অসংখ্য প্রতিক্রিয়া,ক্ষোভ আর কারো কারো উচ্ছাসের ভীড়েও ঠিকই নিবেদিনপ্রাণ ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরা হতাশ,ক্ষুদ্ধ। তারা অনেকেই নিজেদের নেতাদের পদের জন্য নোংরা এই রাজনীতিকে রাঙামাটির ইতিহাসে ‘বিরল ও কুৎসিত’ বলে মন্তব্য করে বলেছেন, ‘দাদা’হীন আওয়ামীলীগের রাজনীতি এই জেলায় কিভাবে চলবে,তারই ড্রেস রিহার্সেল দেখলো রাঙামাটিবাসি।’
