নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
আজ(২ আগস্ট) রাঙামাটির বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও নাট্য ব্যক্তিত্ব রণজিৎ মিত্রের ৮ম প্রয়াণ দিবস। পারিবারিক আয়োজনে গুণী এই শিল্পীকে স্মরণ করছেন তাঁর পরিবার।
রণজিৎ মিত্রের সন্তান অজয় মিত্র জানান, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের উৎসাহে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৬২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ছাত্র হিসেবে ঢাকা চারুকলা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন রণজিৎ মিত্র ও গৌতমমুনি চাকমা। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম সংগঠক আবুল বারাক আলভী ছিলেন সে সময়কার উনাদের ঘনিষ্ঠ সহপাঠী।
৭৫ পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত ছিলেন পরম শ্রদ্ধাভাজন ছৈয়দুর রহমান সাহেবদের সাথে পার্বত্য অঞ্চলে আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম সংগঠক। পালন করেছিলেন তৎকালীণ রাঙামাটি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ না থাকলেও তৎকালীন ডেপুটি কালেক্টর এইচ.টি ইমাম সাহেবের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে সাংগঠনিক সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিলেন।
সংসারের হাল কাঁধে তুলে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘চিত্র বিতান’ স্টুডিও। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাঙামাটি আর্ট স্কুল’। কিছুদিন দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক পত্রিকায় লেখালেখিও করেছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ প্রেসক্লাব ফেডারেশন রাঙামাটি থানা’র সভাপতি। আমৃত্যু সংস্কৃতিমনস্ক বাবা নিজের হাতে গড়া ‘বহুরূপী নাট্য সংস্থা’ থেকে সুনামের সাথেই স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বহু নাটক মঞ্চায়ন করেছিলেন। তৎকালীন উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ও রাঙামাটি জেলা শিশু একাডেমীর চিত্রাংকন ও আবৃত্তি প্রশিক্ষক ছিলেন।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন জেলা শিল্পকলা একাডেমীর অংকন, আবৃত্তি ও নাট্য প্রশিক্ষক। উদ্বোধন পরবর্তী ১৯৯৮ সাল থেকেই বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি কেন্দ্রে নিয়মিত নাটক, নাটিকা, জীবন্তিকা, কথিকা রচনা, পরিচালনা ও তালিকাভুক্ত নাট্য শিল্পী হিসেবে কাজ করেছিলেন।
২০০১ সালে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে জেলার শ্রেষ্ঠ নাট্য ব্যক্তিত্বের সম্মাননা গ্রহণ করেন। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শিল্পী নিকুঞ্জ’ বিশিষ্ট নাট্যজন সম্মাননা ২০০৪ প্রদান করেন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, রাঙামাটি জেলার সভাপতিও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পার্বত্য অঞ্চলের সুপ্রাচীন শ্রী শ্রী রক্ষা কালী মন্দির কমিটিতে দীর্ঘদিন কোষাধ্যক্ষ, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মন্দিরের আজকের এই অবস্থানের পেছনে উনাদের ত্যাগ ও নিরলস শ্রম অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই। ছাত্রজীবনে স্কাউট আন্দোলনে যুক্ত থেকে ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ ভ্রমণ করেন বাবা। নাটক নিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে কোলকাতার বিভিন্ন মঞ্চেও অভিনয় করেছিলেন তিনি।
কোলকাতার একাধিক চলচিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড় পরবর্তী নিজের বড় ভাই সুনীল কান্তি মিত্র মৃতঃ প্রায় শয্যাশায়ী থাকার কারণে।
অজয় মিত্র জানান, বাবার প্রয়াণ দিবসে তেমন কোনও আনুষ্ঠানিকতা নেই। পারিবারিকভাবেই তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যে সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলি প্রতিষ্ঠায় বাবা সারাজীবন শ্রম দিয়ে গেলেন, কেই তাঁকে আজ মনে রাখেনি।
২০১৩ সালের ২ আগস্ট শুক্রবার সকাল ১০.৩০ মিনিটে স্ট্রোকের চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন এই গুণী শিল্পী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ২ পুত্র ও ১ কন্যা সন্তানের জনক, স্ত্রী গৃহিণী।