অজানা আতংকে আজ থমকে গেছে গোটা বিশ্ব। করোনা ভাইরাস যুদ্ধে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। পরিবার পরিজনের বাহিরে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়েও ভাবনার সময় নেই কারো। সামর্থ্যবান মানুষগুলো স্বার্থপরের মত নিজেদের খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংরক্ষণ করে মুখ লুকিয়ে রয়েছে ঘরের মধ্যে। কিন্তু ফুতপাতে শুয়ে থাকা, দিকবেদিক ছুটে চলা মানষিক, শারীরিক, ভারসাম্যহীন মানুষগুলো পড়েছে বিপাকে। খাবারের রেষ্টুরেন্ট গুলো বন্ধ থাকায় রেষ্টুরেন্ট গুলোর ফেলে দেয়া ময়লা আবর্জনা থেকে খাবার কুড়িয়েও খেতে পারছেনা।
খাবারের দোকান বন্ধ থাকায় নিয়মিত দু’একজন ভারসাম্যহীন মানুষদের যারা খেতে দিত, সেটিও আর হচ্ছেনা। লকডাউনে ক্ষুধার্ত মানষিক ভারসাম্যহীন মানুষগুলোয় যেন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছিল। কিন্তু অন্ধকারের মাঝেও আলোক রশ্মি পথ দেখায় ঠিকই। তেমনি করোনা যুদ্ধের সংকটকালীন সময়েও মানষিক ভারসাম্যহীন পাগলদের দূ:খ দূর্দশা চোখ এড়িয়ে যায়নি মানবপ্রেমি রাজেশ দাসের। তার অনুপ্রেরণায় তারই ছোটভাই শিমুল দাস’সহ ক’জন যুবক দিনরাত্রি খোজে খোজে মানষিক ভারসাম্যহীন পাগলদের হাতে খাবার, পানি বোতল, টিস্যু পৌছে দিচ্ছে নিয়মিত। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রেষ্টুরেন্টের ফেলে দেয়া খাবার গুলো কুড়িয়ে খেত ভারসাম্যহীন মানুষগুলো। অনেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পথের দাড়ের পাগলটাকে রেষ্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে প্যাকেট করে দিত।
কিন্তু করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের লকডাউন ঘোষণার পর থেকে খাবারের রেষ্টুরেন্ট, হোটেল গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি খাবারের সংকটের মুখে পড়ে ভারসাম্যহীন পাগল গুলো। পাগলের সুখ মনে মনে। পাগলের জন্য মনের মধ্যে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকা মানুষটির নজরে আসে বিষয়টি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার রান্না করে পাগলদের হাতে পৌছে দেয়ার উদ্যোগ নেন মানবপ্রেমি রাজেশ দাস। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন ছোট ভাই শিমুল দাসের সঙ্গে। দুজনের প্রচেষ্টায় পাগলের জন্য ভালোবাসা খাবার, পানি শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত মানষিক ভারসাম্যহীন মানুষদের খোজে খোজে হাতে পৌছে দেয়ার কাজটি করে যাচ্ছেন তারা। লকডাউনের পর ২৮ মার্চ থেকে কাজটি চলমান রয়েছে।
বান্দরবান শহরের বিভিন্ন স্থানে ৩০ জনের মত ভারসাম্যহীন মানুষ রয়েছে। তবে প্রতিদিন সবাই’কে খোজে পাওয়া যায়না। ত্রিশ জনের খাবার প্যাকেট তৈরি করলেও প্রতিদিনই ৪/৫ জন নিখোজ থাকে। একজন’কে পাওয়া গেলে পরেরদিন আরেকজন’কে পাওয়া যায়না। নিয়মিত ২৪/২৫ জন পাওয়া যায়। বাকি প্যাকেট গুলো ক্ষুধার্ত কুকুর এবং শহরের দরিদ্র প্রতিবন্ধী ২ জনকে দেয়া হয়। মানবপ্রেমি শিমুল দাস বলেন, বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় সমাজের মানুষিক ভারসাম্যহীন পাগল মানুষগুলোর খাবার, পানির বোতল,টিস্যু পেপার প্যাকেট করে হাতে হাতে পৌছে দেয়ার কাজ করছি। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজটি শুরু করেছিলাম। কিন্তু চলমান কর্মযজ্ঞে অনেকে অর্থ দিয়েছেন।
আবার অনেকে রান্না করে খাবার সরবরাহ করছেন। সঙ্গে খাবার পানির বোতলও দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ভাবে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন অনেক মানুষ। কাজটি করতে পেরে ভালো লাগে। মনের মধ্যে এক ধরণের প্রশান্তি অনুভব করি। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের কাজ হচ্ছে ওদের (পাগলদের) খোজে পাওয়া। ওরাতো একি জায়গায় সবসময় থাকেন না। মোটর সাইকেল নিয়ে শহরের মেঘলা, বালাঘাটা, কালাঘাটা, নতুনব্রীজ, পুরনোব্রীজ, বাসষ্ট্যান্ড, হাফেজঘোনা বিভিন্ন স্থানে খোজে খোজে খাবার পৌছে দিতে হয়। শুধু প্যাকেট দিলেই হয়না। প্যাকেট খুলে খাইয়েও দিতে হয় অনেককে। মাঝে মাঝে ওদের আবদারও মেটাতে হয়। না হয় খাবার না খেয়ে ফেলে দেয়। এই কাজে আমার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবি আরও ৮ জন নিরলস ভাবে নিজস্বার্থে কাজটুকু করে যাচ্ছেন। অন্যরা হলো মোবিনুল ইসলাম জিকু, জিয়াউদ্দিন বাবলু, ইমরান উদ্দিন বাবু, মোঃ আইয়ুব, জাহেদুল ইসলাম, রিফাত মির্জা, রিজভী রাহাত, আল-আমিন।
উদ্যোক্তা মানবপ্রেমি রাজেশ দাস বলেন, অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাড়াতে আমার ভালো লাগে। দরিদ্র, অসহায়, ভারসাম্যহীন মানুষগুলোর জন্য আমার মন কান্দে। ছোট বেলা থেকেই এই কাজটি আমি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অর্থনৈতিক ভাবে নিজেও উচ্চবিত্ত কোনো পরিবারের সন্তান নয়। তারপরও ভালোবেসে সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায়, দরিদ্র, ভারসাম্যহীন ক্ষুধার্ত, বঞ্চিত মানুষগুলোর পাশে দাড়াতে চেষ্টা করি। এই কাজে আমি অনেক বেশি তৃপ্তি পায়। যতদিন বেচে আছি, মানব সেবায় কাজটি করে যেতে চায়। কেউ আমাদের সাহায্য সহযোগীতা করুক, আর না’ই করুক।
এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি বলেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা সবার নেই। এটি সৃষ্টিকর্তার অসর্গিক দান। ক্ষুধার্ত সমাজের ভারসাম্যহীন মানুষগুলোর পাশে দাড়িয়েছে আমাদের সন্তানেরা। ওরা আমাদের গর্ব। করোনা মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি বিত্তবান, আ:মীলীগের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ’সহ অনেকে এগিয়ে এসেছেন। যার যার অবস্থান থেকে আমরা বান্দরবানবাসী চেষ্টা করছি। যেখানে যা প্রয়োজন সহযোগীতা করা হচ্ছে। সকলের সম্মলিত প্রচেষ্টায় আমরা ক্রান্তিকাল কাটিয়ে উঠবো।
