জয়নাল আবেদীন,কাউখালী
সরকারী ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক আবার বেসরকারী একটি ব্যাংকের অফিসারও!। একই ব্যক্তি চাকুরী করছেন ২টি প্রতিষ্ঠানে!। বেসরকারী ব্যাংকটিতে নিয়ম অনুযায়ী উপস্থিত থাকলেও প্রভাষক হিসেবে কলেজ কর্তৃপক্ষকে মেনেজ করে সপ্তাহে ৬ দিন উপস্থিত থাকার স্থলে উপস্থিত থাকতেন একদিন। শনিবার ব্যাংক বন্ধ থাকায় সপÍাহের এই দিনটাতেই কলেজে আসেন তিনি। বলছিলাম রাঙামাটির কাউখালী সরকারী ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক বিপুল ভট্টাচার্যের কথা।
অনুসন্ধানে জানাযায়, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ও ২০১৮ সালে জাতীয়করণকৃত কাউখালী সরকারী ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. ইছহাক ও কলেজের অধিকাংশ শিক্ষকদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বনিবনা না হওয়ায় সম্পর্কের অবনতি ঘটে উভয় পক্ষের মধ্যে। গত কয়েকমাস আগে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অধিকাংশ শিক্ষক মিলে বেশকিছু অনিয়মের কথা উল্লেখ করে অভিযোগ দেন কলেজটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারে কাছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত সাপেক্ষে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেন। এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এছাড়াও তিনি নিজেই কলেজ পরিদর্শন করে একটি বেশ কিছু বিষয় উল্লেখ পূর্বক পরিদর্শন প্রতিবেদন ও তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক বরাবরে প্রেরণ করেন। আর এসবের মাঝে কলেজের বিভিন্ন অনিয়মের কথা বেরিয়ে আসছে প্রকাশ্যে। তখনই একজন প্রভাষক ২টি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিপুল ভট্টাচার্য ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক ও ট্রাস্ট ব্যাংক, ক্যান্টমেন্ট উপ শাখা রামু, কক্সবাজারে অফিসার পদে একই সাথে ২টি প্রতিষ্ঠানে একসাথে চাকুরী করে আসছেন। ব্যাংকটিতে নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে ৫ দিন অফিস করলেও কাউখালী কলেজে ৬ দিনের স্থলে উপস্থিত থাকতেন শনিবার ১ দিন। কিন্তু কাউখালী কলেজের শিক্ষক/কর্মচারীদের দৈনিক হাজিরা খাতায় ৬ দিনই উপস্থিত দেখা যায় এই প্রভাষককে!।
সপ্তাহে একদিনের উপস্থিতি থাকলেও কলেজ হাজিরা খাতায় পুরো সপ্তাহের স্বাক্ষর আদায় করে নিতে তার খুব একটা বেগ পেতে হতনা। আর এর পেছনে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ ইসহাকই বিপুল ভট্টাচার্যের জন্য আশির্বাদ হয়ে আছেন বলে মনে করেন কলেজের অধিকাংশ শিক্ষক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের একাধিক প্রভাষক জানান বিশেষ কোন কারণে হয়তো অধ্যক্ষ ১ দিন উপস্থিত থাকা প্রভাষকে ৬ দিন স্বাক্ষর করার সুযোগ দিতেন নিয়ম না মেনেই। যেখানে অন্য কোন প্রভাষক বিশেষ কোন কারণে কলেজে উপস্থিত হতে না পারলে সেদিনই হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত দিয়ে দেওয়া হয়। সম্প্রতি শুনছি এই প্রভাষক চাকুরী ছেড়ে দিবেন এমন বলছেন। এটা ছাড়া আর কোন অপশনও নেই মন্তব্য করে তারা বলেন গত ২২ আগস্টের সরকারের এক আদেশে ২৪ আগস্টের পর থেকে শনিবারও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে। তাই এই প্রভাষক যে ১ দিন কলেজে আসতেন সেদিনতো এমনিতেই বন্ধ তাই এই পথ বেছে নেওয়া ছাড়া কোন সুযোগ নেই।
অনুসন্ধানে জানাযায়, দীর্ঘ সময় কলেজের অভ্যন্তরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও অধিকাংশ শিক্ষকদের চলে আসা দ্বন্দ্ব নিয়ে বেশ কিছু পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর ১১ আগষ্ট হঠাতই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক আরিফ ইলাহী কাউখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজ পরিদর্শনে আসেন। কলেজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময়ের সময় কলেজের অপরাপর শিক্ষকরা বিপুল ভট্টাচার্যের দু’স্থানে চাকুরীর বিষয়টি পরিচালকের নজরেও আনেন। এসময় তিনি প্রাথমিক খোঁজ খবর নিয়ে এর সত্যতাও পান।
কলেজ জাতীয়করণের আগে কলেজ গভর্নিং বডি কর্তৃক ২০১২ সালে ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান বিপুল ভট্টাচার্য। কলেজটিকে জাতীয়করণের ঘোষনা দেয়া হয় ২০১৮ সালের ৮ আগষ্টে। এর আগ পর্যন্ত ননএমপিও হিসেবে দৈনিক উপস্থিতির ভিত্তিতে একটি সম্মানি প্রাপ্য হবেন হিসেবে চাকুরী করেন। কলেজ জাতীয়করণ হওয়ার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ মাসিক একটি সম্মানী নির্ধারণ করেন। যা ২০১৮ সালের আগস্ট মাস থেকেই কার্যকর হয়। একই সাথে ২০১২ থেকেই ট্রাস্ট ব্যাংকে অফিসার পদে চাকুরী করে আসছেন অদ্যবধি পর্যন্ত।
এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে কথা হয় ট্রাস্ট ব্যাংক রামু শাখার ব্যবস্থাপক লিটন কান্তি নাথ ও ক্যান্টনমেন্ট উপ শাখার ব্যবস্থাপক এর সাথে তাঁরা জানান, বিপুল ভট্টাচার্য দীর্ঘ সময় ধরে এ ব্যাংকে কর্মরত আছেন। সপ্তাহে ৫ দিনই নিয়ম অনুযায়ী অফিস করছেন।
কথাহয় বিপুল ভট্টচার্যের সাথে- তিনি বলেন কাউখালী কলেজে প্রভাষক হিসেবে জয়েন দিয়েছি শিক্ষকতা পেশাকে ভালোবেসে। কলেজ জাতীয়করণে পর থেকে আমি কলেজ থেকে কোন সুযোগ সুবিধা নেইনি উল্লেখ করে তিনি বলেন যেহেতু আমি এখনো রাজস্বখাতে স্থানান্তর হইনি তাই আমি একই সাথে ৫টি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতে পারি। আইনে এতে কোন বাঁধা নেই। এখন যেহেতু এগুলো নিয়ে এতো কথা উঠছে তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কলেজের চাকুরীটা ছেড়ে দিবো।
এবিষয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ ইসহাক এর সাথে বৃহস্পতিবার দুপুরে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। প্রতিবেদকের প্রশ্নে, সপ্তাহে একদিন এসে বাকি ৫ দিন অনুপস্থিত থাকেন কিভাবে? এবং সপ্তাহ শেষে পুরো সপ্তাহের হাজিরা খাতায় কিভাবে স্বাক্ষর করেন এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যক্ষ বলেন এই সিস্টেমটা আমি দায়িত্বভার গ্রহণ করার আগে থেকে (জুন ২০১৯) চলে আসছে। আমি নতুন করে কিছু শুরু করিনি। এলাকার স্বার্থে, কলেজের স্বার্থে একজন ভালো প্রভাষক হিসেবে যাতে করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ইতিহাস বিভাগের ডিগ্রি পর্যায়ে একটি পদ সৃষ্টি হয় সে জন্যই এই সুযোগ দেওয়া। এতে আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। এসময় তিনি উক্ত প্রভাষক চাকুরী থেকে অব্যহতি নিবেন এমন একটি কথা বলে যেহেুত চাকুরী থেকে অব্যহতি নিবে তাই নিউজ করার দরকার কি বলে মন্তব্য করেন। এবং নিউজ হলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন হবে মন্তব্য করে নিউজ না করার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।
