মুফিজুর রহমান, নাইক্ষ্যংছড়ি ॥
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু’র কোনারপাড়া সীমান্তে গোলাবর্ষণ এবং মর্টার শেল নিক্ষেপে হতাহতের ঘটনায় নো ম্যান্স ল্যান্ডে থাকা রোহিঙ্গাদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর থেকে রোহিঙ্গারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এছাড়া আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে অনেক স্থানীয়রাও নিজেদের বৃদ্ধা মা-বাবা ও শিশুদের অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় তুমব্রু’র বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান।
সীমান্তের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানে শুক্রবার রাতেই ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উখিয়া কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করেছে এসএসসি-সমমানের পরীক্ষা কেন্দ্র। হস্তান্তরকৃত নতুন কেন্দ্রে ৪৯৯ জন পরীক্ষার্থী শনিবার পরীক্ষা দিয়েছেন। এমনটাই জানিয়েছেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা ফেরদৌস।
শুক্রবার রাতে ঘুমধুম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কোনারপাড়া এলাকায় নো ম্যান্স ল্যান্ডে থাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কয়েকটি মর্টার শেল বিস্ফোরণ হয়। এতে এক যুবক নিহত ও আরও ৫ রোহিঙ্গা আহত হন। আহতরা উখিয়া কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে।
তুমব্রু ২নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য দিল মুহাম্মদ ভূট্টো জানান, শুক্রবার রাতভর গোলাবর্ষণ ও মর্টারশেল নিক্ষেপের পর শনিবার সকাল থেকে বিরতিহীনভাবে চলছে গোলাবর্ষণ। গুলির বিকট শব্দে এপারের ভূমি পর্যন্ত কেঁপে উঠছে। আতংকে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। স্থানীয় কৃষক নুরুল ইসলাম জানান, সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণ বন্ধ নেই। ফলে তাদের কৃষিকাজ বন্ধ রয়েছে। সীমান্তে মাইন আতংকেও ভুগছেন চাষীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসিনা আক্তার বলেন, মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টারশেল তাদের বাড়ির উঠানে পড়েছে। এছাড়া রাতভর বিকট শব্দে গুলির আওয়াজে বাড়ির শিশু-বৃদ্ধারা ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভেজ তিবরীজি সাংবাদিকদের বলেন, নো ম্যান্স ল্যান্ডে ৩টির মতো গোলা এসে পড়লে একটি বিস্ফোরিত হয়। যারা হতাহত হয়েছেন তারা সবাই রোহিঙ্গা। ঘটনার পর নো ম্যান্স ল্যান্ডে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে যারা আছেন তাদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে নতুন করে কেউ যাতে অনুপ্রবেশ করতে না পারে এজন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছে।
তুমব্রু সীমান্তের বিপরীতে নো ম্যান্স ল্যান্ডে পাঁচ বছর ধরে আশ্রয় ক্যাম্প গড়ে তুলে বসবাস করছেন মিয়ানমারের বাড়িঘর হারা ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পর পিছনেই মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়া ও রাখাইন রাজ্যের একাধিক পাহাড়।
এর আগে, গত ২৮ আগস্ট মিয়ানমার থেকে ছোঁড়া ২টি মর্টার শেল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তের উত্তরপাড়া মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় এসে পড়ে। পরদিন সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল সেটি নিস্ক্রিয় করে। তার ঠিক ২দিন পর ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার থেকে গোলা এসে পড়ে।
এদিকে গত শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তিন নাম্বার ওয়ার্ডের তুমব্রু হেডম্যান পাড়া এলাকায় মিয়ানমার সীমান্তের ৩৫ নাম্বার সীমান্ত পিলারের কাছে কাটাতাঁরের বেড়ার কাছাকাছি গেলে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীদেও পুতে রাখা ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরিত হয়। এতে বাংলাদেশী যুবকের একটি পায়ের নিচের অংশ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে যায়। আহত যুবকের নাম অন্ন্যাথাইং তঞ্চঙ্গ্যা (২২)। তারবাড়ি সীমান্তবর্তী ঘুমধুম ইউনিয়নের হেডম্যান পাড়ায়। খবর পেয়ে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত যুবককে উদ্ধার করে। পরে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুবককে কক্সবাজার হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
