পাহাড়ে রাজনীতি আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত ৫ ডিসেম্বর জুরাছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একইদিন বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি রাসেল মারমার ওপর হামলা করা হয়। এর প্রতিবাদ জানাতে জেলা আওয়ামীলীগের প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে মধ্যরাতে রাঙামাটি শহরেই নিজ বাসায় হামলার শিকার হয় মহিলা আওয়ামীলীগের জেলা কমিটির সহসভাপতি ঝর্ণা খীসা। এসব ঘটনায় আওয়ামীলীগ সরাসরি জেএসএসকে দায়ী করলেও জেএসএস তা অস্বীকার করেছে।
আওয়ামীলীগের অভিযোগ, পাহাড়ি যারা আওয়ামীলীগ করছে তাদেরকে টার্গেট করে, তাদের ওপরই হামলা কিংবা হত্যা করছে জেএসএস। পাহাড়ি যারা আওয়ামীলীগের রাজনীতি করছে তাদেরকে টার্গেট করা হলেও পাহাড়িদের মধ্যে যারা বিএনপি করছে তাদের ওপর কোনও চাপ সৃষ্টি করছে না বলে অভিযোগ করেছে আওয়ামীলীগ। তবে বরাবরের মতো জেএসএস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
আওয়ামীলীগ নেতারা জানায়, ইতোমধ্যে আওয়ামীলীগে যেসব পাহাড়ি নেতাকর্মী রয়েছে তাদের মধ্যে তিন উপজেলায় সব মিলিয়ে প্রায় ৫ শতাধিকের বেশি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন জীবনের ভয়ে। সবচেয়ে বেশি পদত্যাগ করেছে জুরাছড়ি উপজেলা থেকে। সেই ক্ষেত্রে উল্টো অবস্থানে বিএনপির পাহাড়ি নেতাকর্মীদের। এখন পর্যন্ত বিএনপির কোনও পাহাড়ি নেতাকর্মীর পদত্যাগের খবর পাওয়া যায়নি। বরং খোশ আমেজে তারা বনভোজনে অংশ নিচ্ছেন !
একদিকে পাহাড়িরা আওয়ামীলীগ না করার জন্য হুমকি-ধামকি অন্যদিকে বিএনপি পাহাড়ে করছে পুনর্মিলনী উৎসব বা বনভোজনে মেতে ছিলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে এখন এই নিয়ে নানান আলোচনা। আওয়ামীলীগের অভিযোগ, আওয়ামীলীগকে ঠেকাতে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ভয়ভীতির মাধ্যমে পাহাড়ি নেতাকর্মীদের পদত্যাগে বাধ্য করা হলেও বিএনপির ক্ষেত্রে সে চাপ নেই । তাদের অভিযোগ, হয়তো নির্বাচনকে সামনে রেখে জেএসএসের সাথে বিএনপির কোন গোপন সমঝোতা হয়েছে।
আওয়ামীলীগ নেতা হত্যার প্রতিবাদে গত ৭ ডিসেম্বর হরতাল পালন করে জেলা যুবলীগ। এর পরের দিন গত ৮ ডিসেম্বর বিএনপিতে যারা পাহাড়ি নেতাকর্মী রয়েছে, তাদের নিয়ে বনভোজনে যায় কেন্দ্রীয় নেতা মনীষ দেওয়ান নেতৃত্বাধীন বিএনপির একটি অংশ। বিষয়টি এখন রাঙামাটি সর্বমহলে আলোচিত বিষয়।
রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ চাকমা বলেন, ‘আমরা সব সময় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করি আর বিএনপি ও জেএসএস সম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয়। যখন আওয়ামীলীগ সরকার পার্বত্য চুক্তি করে তখন বিএনপি কালো পতাকা নিয়ে সারা দেশে মিছিল করে। সাবেক পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি দীপংকর তালাকুদারের অক্লান্ত সহযোগিতা চুক্তির বাস্তবায়নে এগিয়ে যায়। শান্তি চুক্তির পরের নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে জেএসএস মাঠে নিমে বিএনপির প্রার্থী মনি স্বপণ দেওয়ানকে মৌন সমর্থনের মাধ্যমে। এখানে সব কিছু পরিষ্কার, আঞ্চলিক দলগুলো অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ধ্বংস করে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে অশান্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত।
জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. মুছা মতব্বর বলেন, আমরাও আশ্চর্য হচ্ছি বিষয়টি চিন্তা করে। যেখানে পাহাড়ি আওয়ামীলীগকে দল থেকে পদত্যাগের জন্য জেএসএস হত্যার রাজনীতিতে নেমেছে, সেখানে বিএনপিকে তারা জামাই আদর করছে। বিএনপির সাথে জেএসএসের সম্পর্ক বরাবরই ভালো ছিল। কারণ হলো বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন চুক্তির কোন ধারা বাস্তবায়ন করেনি বা করার চেষ্টাও করেনি। আর তারাও চুক্তি বাস্তবায়নের কোনও চাপ দেয়নি তাদের। আমরা চুক্তি বাস্তবায়নের কাজের গতি যখন বাড়িয়ে দিলাম তখন তারা এটি যাতে বাস্তবায়ন না হয় সে জন্য পার্বত্য অঞ্চল উত্তপ্ত করে চেষ্টার লিপ্ত। এর মূল কারণ হলো চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে তাদের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষে যেভাবে তারা চুক্তির কথা বলে ধোকা সেটি বন্ধ হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে রাঙামাটির জাতীয়তাবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দীপন তালুকদার দীপু বলেন, আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের নিয়ে বনভোজনে গিয়েছি। এটা পূর্ব নির্ধারিত ছিল। তবে আঞ্চলিক দলের চাপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আঞ্চলিক দলগুলো শুরু থেকেই পাহাড়ি নেতাকর্মীদের চাপ দিয়ে আসছে, তা এখনও বলবৎ আছে। পাহাড়িরা যাতে জাতীয় রাজনীতি না করে এটাই আঞ্চলিক দলের মূল লক্ষ্য। আমরা পাহাড়ি- বাঙালি এক সাথে কাজ করার চেষ্টা করছি। কারও চাপের কাছে আমরা নতি স্বীকার করি না। আর জেএসএসের সাথে বিএনপি কোনও সমঝোতাও সম্ভাবনা নেই বলে দাবি করেন।
পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, বিএনপির সাথে কোনও সমঝোতা হয়নি বা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, তারা এক আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করে, আর আমরা আরেক আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করি। হত্যা বা হামলার সাথে জেএসএস জড়িত নয় বলে তিনি দাবি করে জানান, কিছু মানুষ আছে যখন চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে যায় তখন পরিস্থিতি ঘোলাটে করে চুক্তি বাস্তবায়নের বাধা তৈরি করে।