রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ মুখ এলাকায় রাঙামাটি মডেল স্কুল এন্ড কলেজের কার্যক্রম কোনও প্রকার অনুমোদন ছাড়াই চলছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করলেও বিদ্যালয়ের পাঠদানের কোনও অনুমোদনই নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া সব বিদ্যালয়ে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন বাধ্যতামূলক হলেও এই বিদ্যালয়ে নিয়মিত জাতীয় সঙ্গীতও পরিবেশন করা হয় না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটি ও বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ থেকে অন্যান্য পদে যেসব শিক্ষক রয়েছে তারা প্রায় সবাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক আদর্শে দীক্ষিত বলে জানা গেছে। মূলত বিদ্যালয়টির মাধ্যমে তারা তাদের আদর্শ বাস্তবায়ন চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। একই সাথে স্কুলটির নামের সাথে কলেজ ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে নেই তার অস্তিত্বও।
এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাঙামাটি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ শুরু থেকেই রাঙামাটি সিনিয়র মাদ্রাসায় কক্ষ ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু, সিনিয়র মাদ্রাসায় ভাড়া পরিশোধ না করায় ও একটি রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নের অভিযোগ পাওয়ায় বিদ্যালয়ে কার্যক্রম সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন সিনিয়র মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে বিদ্যালয়টি রিজার্ভ মুখ এলাকায় একটি বাসার দোতলা ভাড়া নিয়ে পুনরায় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে। গত ৩০ জুলাই একটি শিক্ষার্থীকে আপত্তিকরভাবে বেত্রাঘাত করায় ও বিভিন্ন অপবাদ দেয়ার এক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। পরে এলাকাবাসী শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে রাঙামাটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে চট্টগ্রামে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষকসহ আরো দুইজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে শিক্ষার্থীর বাবা। মামলার পর পুলিশ আসামিদের ধরতে মাঠে নামে। এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষককে বাঁচাতে চেষ্টা চালাচ্ছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত ৪ আগস্ট অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচারের দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন করলেও পরেরদিন একই স্থানে অভিযুক্ত শিক্ষককে বাঁচাতে বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মানববন্ধন করে বিদ্যালয়টি। এসময় মানববন্ধনে জামায়াত ও শিবিরের বিভিন্ন নেতাকর্মীকে অংশ নিতে দেখা যায়। এই ঘটনায় আত্মহত্যা চেষ্টা চালানো শিক্ষার্থীর পক্ষে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবস্থান না নিয়ে উল্টো নিপীড়কের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মানুষ। এদিকে সব বিদ্যালয়ে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন বাধ্যতামূলক থাকলেও এই বিদ্যালয়ে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয় না। এছাড়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের যেসব যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন, সেটাও অনুসরণ করা হয়নি। ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন নেয়াও হয়নি বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির ১১ সদস্যের বেশিরভাগই জামায়াতের রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়ে নিয়মিত জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এলাকার বাসিন্দা সুধীর দাশ বলেন, বিদ্যালয়টি জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য পরিচালিত হচ্ছে। পরিচালনা কমিটি থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শিবিরের মতাদর্শ ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের অন্যান্য বিদ্যালয়ে শিফট করে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানান তিনি।
এই বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, ‘কোনভাবেই বাচ্চাদের ব্যবহার করে কোনও বিদ্যালয় মানববন্ধন কিংবা অন্যকোনও আন্দোলনে জড়াতে পারে না। এটা অন্যায়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার খোরশেদ আলম জানান, বিদ্যালয়টির কোনও অনুমোদন নেই। এছাড়া বিদ্যালয়টি কিভাবে বই পায়, সে বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখবো।
জেলা শিক্ষা অফিসার উত্তম খীসা জানান, বিদ্যালয়টির ভূমি নেই। কমিটির অনুমোদন নেই। পাঠদানের কোনও অনুমতিও নেই। এক কথায় গোপনে তারা তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একটি সরকারি অফিসের কম্পিউটার অপারেটর। প্রধান শিক্ষক হওয়ার কোনও যোগ্যতা না থাকার পরও তিনি ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। কোনও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই বিদ্যালয়টি পরিচালনা করা হচ্ছে। আমরা বিদ্যালয়টির বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সড়ক বিভাগের কম্পিউটার অপারেটর ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির তোফায়েল আহম্মেদ মঙ্গলবার সকালে সড়ক বিভাগের অফিসে এ বিষয়ে কথা বলেন। পাঠদানের কোনও অনুমোদন নেই স্বীকার করে তিনি বলেন, পাঠদানের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে সব বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যালয়ে সবকিছুই নিয়ম অনুসরণ করেই পরিচালিত হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। আমি জেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
