পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের বলি হয়েছে এবার বেশ কয়েকটি দোকান ও বসতঘর। মারধর করা হয়েছে স্থানীয় নারীদের। এর আগে ৪০/৫০ জনের সশস্ত্র দল এলাকায় পৌছে ফাঁকা গুলি ছুঁয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে স্থানীয়দের মধ্যে। পরে অস্ত্রধারীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তিনটি গ্রামের প্রায় ৩কি.মি. সড়কে ছড়িয়ে পরে ঘন্টা ব্যাপি চালায় তান্ডব। গত রবিবার সকালে দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের ১২কি.মি. নামক এলাকার নোয়াপাড়া, বাজেপাতাছড়া ও আমতলি গ্রামে ঘটে এ ঘটনা।
ভুক্তভোগী এবং প্রত্যক্ষ্যদর্শীরা জানান, সকাল ৭টার দিকে কয়েকটি মোটর-সাইকেল এবং সিএনজিযোগে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এলাকায় গিয়ে পৌছে ফাঁকাগুলি ছুড়তে থাকে। এসময় আতঙ্কে গ্রামের পুরুষরা পালাতে শুরু করে। অস্ত্রধারীদের গায়ে ছিল কালো রংয়ের এবং সেনাবাহিনীর পোষাকের আদলের পোষাক। তবে অস্ত্রধারীরা সকলেই পাহাড়ি। হামলাকারীরা সড়কের পাশ্ববর্তি দোকানে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। দোকানের মালামাল, আসবাব পত্র বাহিরে বের করে ফেলে দিয়ে নষ্ট করে। তছনছ করে দেওয়া হয় দোকান ঘর। বেশ কয়েকটি দোকানে এ রকম হামলা চালানো হয়। একটি দোকানে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায়। পরে অবশ্য নারীদের প্রচেষ্টায় সে আগুন নিভানো সম্ভব হয়েছে। এর পর একইভাবে হামলা চালানো হয় স্থানীয়দের বাড়িঘরে। হামলার সময় পুরুষদের না পেয়ে নারীদের মারধর করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এসময় হামলাকারীরা বলছিল, ইউপিডিএফ কর্মীরা (প্রসিত) সে এলাকায় আসা-যাওয়া করে; এলাকায় আশ্রয়-প্রশ্রয় পায় এটাই এলাকাবাসীর অপরাধ।
ঘটনার খবর পেয়ে দুপুরের দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ঘটনাস্থলের আগে-পরে প্রায় ৭কি.মি. এলাকাজুড়ে সকল দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। কোথাও কোনও পুরুষের উপস্থিতি নেই। পুরো এলাকাজুড়ে থমথমে অবস্থা; বিরাজ করছে আতঙ্ক। নোয়াপাড়া এলাকায় ভাঙচুর করা হয়েছে বিটনের দোকান। সে দোকানে একজন বৃদ্ধাকে দেখা যায় চুপচাপ বসে থাকতে। তিনি কিছু বলতে রাজি হননি। বাজেপাতাছড়া এলাকায় ভাঙচুর করা হয়েছে শিশু চাকমার দোকান। সেখানে সুজয় চাকমা নামে ৭বছর বয়সি এক শিশুকে পাওয়া যায়। সুজয় জানায়, পার্টির লোকেরা সকালে এসব করে গেছে।
আমতলি গ্রামে ভাঙচুর করা হয়েছে সমেশ চাকমার দোকান। সে দোকানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সমেশের স্ত্রী পদ্মদেবী চাকমা (৩০) বলেন, ‘আমাদের কী দোষ? আমরা নাকি ইউপিডিএফের লোকদের আশ্রয় দেই। অস্ত্র নিয়ে যারা আসে প্রাণের ভয়ে তাদের কথা মানতে হয়, এটাও কী দোষ? এ দোকানের আয় দিয়েই সংসার চলতো, এখন কী ভাবে সংসার চালাব।’
একই গ্রামের মিনতি চাকমা (৪০) জানান, তাঁর ঘরের আসবাবপত্র, পানির ট্যাংকি, সোলার প্যানেলসহ প্রয়োজনীয় সকলকিছু ভাঙচুর করেছে। একই গ্রামের ইন্দ্রলতা (৭০) বলেন, ‘স্যার আমি প্রায় সময় মন্দিরে থাকি। আমার একটি মোবাইল ছিল, সেটিতে আমি ধর্মীয় বাণিগুলো সব সময় শুনতাম। সে মোবাইলটিও নিয়ে গেছে। স্যার দয়া করে আমাকে একটা মোবাইল দিয়ে যান।’
পাশেই ক্ষেত্রপুর জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়। সে বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রনেল চাকমা জানায়, তার সামনে তাঁর মা দীপিকা চাকমাকে লাঠি দিয়ে মারধর করেছে অস্ত্রধারীরা। ভাঙচুর করেছে তাদের ঘরের আসবাবপত্র। এ দৃশ্য দেখার পর তার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই ছিল তার পরীক্ষা, আতঙ্ক নিয়ে বিদ্যালয়ে গেলেও পরীক্ষায় সে ভাল করে কিছু লিখতে পারেনি।
৭ম শ্রেণীর অপর শিক্ষার্থী স্বপন জ্যোতি চাকমা জানায়, তাদের ঘরের আসবাব পত্রও ভাঙচুর করা হয়েছে। এক পর্যায়ে পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখে সেখানেও মানুষের ঘর বাড়িতে তান্ডব চালাচ্ছে অস্ত্রধারীরা। তখন বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে।
বাঘাইছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ এম এ মঞ্জুর জানান, ‘আধিপত্য বিস্তারের কারণে এ রকম ঘটনার সংবাদ তিনি জেনেছেন, সম্ভবত ইউপিডিএফ বিরোধী কোনও সংগঠন করে থাকতে পারে।’
