অজয় মিত্র ॥
যেদিন দেখবো শ্মশানে শিউলী ফুল ছড়িয়ে আছে, সেটা যার শ্মশানই হোক, সেদিনই খুব শান্তি পাবো-বলছিলেন মানস।
আমরা তো প্রায়শ সবকিছুরই সমালোচনা করি, কিন্তু নিজেরা কি করি, সেটা কখনো ভাবি না। যেমনটা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকি সব সময়, নিজের পরিপাটি নিরাপদ জীবন, নিজের স্বার্থ একদম ১৬ আনায় ১৬ আনা। কিন্তু নিজেদের সংগ্রাম, অর্থ, বৈভবের কর্মময় জীবনের ভিতর কখনো কি চিরন্তন গন্তব্য, যে গন্তব্যে নিজেদের পূর্বসূরি’রা অনেকেই শায়িত, সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবি? বলছিলাম আসামবস্তি হিন্দু ও বৌদ্ধ কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের কথা।

আমাদের সে ভাবনাটাই ভাবছে নিরুপম ত্রিপুরা, মানস মজুমদারদের মত কিছু উদ্যোমী তরুণ। যারা এক সপ্তাহের বিরতিতে গত শুক্রবার ২য় বার স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের পকেটের টাকা ও অন্যান্য কিছু সহযোগিতায় শ্মশানের চারপাশের বন জঙ্গল, ঝোপঝাড় কেটে ছেটে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করছেন। এবার একেবারে অকটেন চালিত কাটার মেশিন দিয়ে আগাছাগুলো নিখুঁত ভাবে পরিষ্কার করছিলেন।
এরা প্রত্যেকেই কর্মজীবী, এদেরও শুক্রবার মানেই আয়েশী দিন, কিন্তু তারা আজকের অবসর সময় আমাদের মত আলস্যে না কাটিয়ে, যে মাটিই আমাদের পুর্বাপর প্রত্যেকেরই ঠিকানা, সে মাটিতেই আলো ফোটাতে ব্যস্ত।
শ্মশান গুরুগম্ভীর মন ভারী করার জায়গা হলেও, দীর্ঘদিনের জঞ্জাল মুক্ত হতে হতে ক্রমেই যেন হাসছে চারপাশটা। ঝোপঝাড় পরিষ্কার হওয়ায় সীমাবদ্ধ জায়গাতেও শ্মশানের অনেক বিস্তৃতি ও পরিচ্ছন্নতা এখন দৃশ্যমান। পরিচ্ছন্নতার অভিযানে এমনও কিছু শ্মশান বেড়িয়েছে, যেগুলো দেখলেই বোঝা যায়, তাদের উত্তরসূরিদের আনাগোনা একেবারে শূণ্যের কোটায়।

এ নিয়ে মানস আক্ষেপ করেই বলছিলেন, শ্মশান তো শ্মশান, এখানে বিভিন্ন সময়ে আধপোড়া শবদেহও দেখেছি। মনে হয় জ্ঞাত গুষ্টি স্বজন’রা কোন রকমে মুখাগ্নি করে আর কোন সময় ফিরেও তাকায়নি। পরে আবার নিজেরা দাহ করেছি যথানিয়ম মেনে।
নিরুপম ত্রিপুরা, মানসদের পরিকল্পনায় আরও একধাপ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পর, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের উদেশ্যে নিমগাছ, আমগাছ, শিউলী ফুল গাছ লাগানোর কথা জানালেন। মানস বলেন, একদম মুখে হওয়ায় যেভাবে সামনের বটগাছটা ঘিরে ধরে গাছটার আশেপাশে দাহ করার জন্য, বিভিন্ন দিকে আরো ২/৩টা বটগাছ লাগাবো, যাতে গাছগুলো ঠিকঠাক বড় হলে, সুন্দর ভাবে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায় দাহ করে, অন্তত এক জায়গার উপর চাপ কমবে।
এই অকৃত্রিম তরুণদের সমন্বয়ে শ্মশানের যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত সঠিকভাবে চলার জন্য কার্যকর ও দৃশ্যমান কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হোক, যাতে সকলের চিরন্তন গন্ত্যবের পরিবেশ হোক পরিচ্ছন্ন ও নির্মল।
