শংকর হোড়
দেশের বিভিন্ন স্থানে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। রোদ ও ভ্যাপসা গরমে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিদ্যুতের কোনো কোনো গ্রাহক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অনেকে বিরক্তি প্রকাশ করে দিচ্ছেন ফেসবুকে পোস্ট। বিশেষ করে রাত ১২টা থেকে সকাল পর্যন্ত ঘুমানোর সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে গ্রাহকরা চরম বিরক্তি প্রকাশ করছেন। এদিকে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং দেয়ার কথা বললেও বেশির ভাগ এলাকায় ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে যেমন ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় তেমনি ক্ষতি হচ্ছে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-বাণিজ্যে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, সমস্যা যতদিন সমাধান হবে না, ততদিন তাদের কিছু করার নেই।
বিদ্যুৎ বিভাগ দৈনিক কি পরিমাণ লোডশেডিং দিচ্ছে এমন কোন প্রকৃত হিসাব না দিলেও রোববার রিজার্ভ বাজার ফিডারে খোঁজ রেখে দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন ছিল এলাকাটি। রোববার রাত ১২টা থেকে এই হিসাব করা হয়। এরমধ্যে রাত ২টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা সাত মিনিট পর অর্থাৎ ৩টা ০৭ মিনিটে বিদ্যুৎ দেয়া হয়। এরপর সকাল ১০টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ আসে ১১.১০ মিনিটে। এর ২০ মিনিট পর আবারো বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ১০ মিনিট পর আবারো বিদ্যুৎ দেয়া হয়। আধ ঘণ্টা পর আবারো ১২.২৫ মিনিটে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার প্রায় ৪০ মিনিট পর ১.০৫ মিনিটের দিকে বিদ্যুতের দেখা পায় রিজার্ভ বাজারবাসী। আবার ঘণ্টা দেড়েক পর ২.৫০ মিনিটে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ৩.৪০ মিনিটে বিদ্যুৎ আসে। বিকাল পাঁচটায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর আবারো সে বিদ্যুতের দেখা মেলে ৫.৪৭ মিনিটে। এবার দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ঠিক থাকার পর রাত ৮টায় আবারো বিদ্যুৎ চলে যায়। তবে এবার ১৩ মিনিট পর বিদ্যুৎ চলে আসে। পরে রাত ১১.১০ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার এক ঘণ্টা পর ১২.১০ মিনিটে বিদ্যুতের দেখা পায় এলাকাবাসী।
শুধুমাত্র রাঙামাটি শহরের একটি এলাকার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটবার লোডশেডিং দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে মোট লোডশেডিংয়ের সময় ৫ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট অর্থাৎ প্রায় ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকছে এক-একটা এলাকা। একটি এলাকার হিসাব ধরে শহরের সামগ্রিক চিত্র একই। ক্ষেত্রবিশেষে এই হার আরো বেশি হচ্ছে বলে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মত।
এদিকে পিডিবি’র ওয়েবসাইটে রাঙামাটি জেলায় ১ আগস্ট সোমবার লোডশেডিং সংক্রান্ত যে শিডিউল দেয়া হয়েছে তাতে দেখা যায় রিজার্ভ বাজার ফিডারে বিদ্যুৎ না থাকার কথা ভোর ৫টা, সকাল ১১টায়, বিকাল ৪টা ও রাত আটটায়। তবে সোমবার দুপুরে রিপোর্ট লেখা পযন্ত আংশিক বিদ্যুৎ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সকাল ১০টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সাড়ে ১১টায় বিদ্যুৎ আসে, আবারো সাড়ে বারোটার দিকে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ আসে ১.১০ মিনিটের দিকে। এই চিত্র শুধু রিজার্ভ বাজার নয়; সামগ্রিক জেলায়। অর্থাৎ সরকার ঘোষিত লোডশেডিং শিডিউল একেবারেই মানা হচ্ছে না।
রাঙামাটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাসেল কুমার দে বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় কর্মচারীদের বসে থাকতে হচ্ছে, কিন্তু তাদের বেতন তো আর বন্ধ রাখা যাবে না। সঠিক সময়ে পণ্য ডেলিভারি দিতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। সরকারি কাজেও সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের পদক্ষেপে আমরাও সহযোগিতা করতে চাই, তবে সেক্ষেত্রে ঘন ঘন লোডশেডিং না দিয়ে নির্দিষ্ট একটা সময় নির্ধারণ করে দিলে আমরা সেসময় বিদ্যুতের কাজগুলো ছাড়া অন্য কাজগুলো সেরে নিতে পারতাম। এতে লোকসানও কম হতো।
রাঙামাটি পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও জন্মনিবন্ধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ আল মাহমুদ সোহেল এই প্রসঙ্গে বলেন, জন্মনিবন্ধনের কাজটি সম্পূর্ণ সার্ভারের ওপর নির্ভর। এজন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন। সার্ভার থাকলে বিদ্যুৎ থাকে না, বিদ্যুৎ থাকলে সার্ভার থাকে না, এতে আমরা সঠিক সময়ে পৌর নাগরিকদের জন্মনিবন্ধন সরবরাহ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের শিডিউল দেয়া হলে এবং সেটা সঠিকভাবে বিদ্যুৎ বিভাগ মেনে চললে সঠিক সময়ে জন্মনিবন্ধন দেয়া সম্ভব হবে। এতে সাধারণ মানুষের হয়রানিও কমবে।
এদিকে বিদ্যুতের চাপ কমাতে রাত আটটার পর দোকানপাট বন্ধে প্রশাসনের তৎপরতা চোখে দেখার মতই। প্রতিদিন রাত আটটা বাজলেই প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা দোকান বন্ধের বিষয়ে তদারকি করছেন। কিন্তু দোকান বন্ধ হলেও বন্ধ হচ্ছে না লোডশেডিং। মধ্যরাতেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গ্রাহকরা আরো বেশি ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লোডশেডিং নিয়ে তাদের ক্ষোভ জানাচ্ছেন। রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার এলাকা চম্পকনগরের বাসিন্দা শিক্ষক উত্তম গোমেজ সোমবার ভোর ৪.১৪ মিনিটে তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেন- ‘আমরা তো মানুষ।। এই ভোররাতে লোডশেডিং দিয়ে এতো কষ্ট দেওয়ার মানে কি?? যাদের দুর্নীতির কারনে আজকে আমরা কষ্ট পাচ্ছি… সেই……….. রা ঠিকই আরামে ঘুম যাচ্ছে।’
লোডশেডিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুর রহমান বলেন, কেন্দ্রে আমরা আজ(সোমবার) চাহিদা দিলাম ২৫ মেগাওয়াট, কিন্তু তারা দিচ্ছে ১০ মেগাওয়াট। রাতে চাহিদা দিচ্ছি ২০ মেগাওয়াট কিন্তু তারা দিচ্ছে ১০ মেগাওয়াট। এতে আমাদের লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এখানে আমাদের কিছুই করার নেই। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেভাবে দিচ্ছে আমাদের সেভাবেই কাজ করতে হচ্ছে। যতক্ষণ সব স্বাভাবিক হচ্ছে না, ততক্ষণ কিছুই করার নেই বলে অসহায় আত্মসমর্পণ এই প্রকৌশলীর। রাঙামাটিতে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৩০ মেগাওয়াট বলে তিনি জানান।
লোডশেডিং শিডিউলের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি লোডশেডিং শিডিউল মেনে চলতে, কিন্তু সেটা পুরোপুরি মেনে চলাও সম্ভব হচ্ছে না।
