শুভ্র মিশু ॥
রাঙামাটি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ও কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যার কারণে রাঙামাটির জনসংখ্যা অনুপাতে হিসেব করলে প্রতিজন মানুষের দৈনিক চাহিদার ৬০ গ্রাম মাছের প্রয়োজনীয়তার জায়গায় আমরা ৬২ গ্রাম মাছ উৎপাদন করতে পারছি। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে সাংবাদিকদের সাথে আয়োজিত মতবিমিনয় সভায় এই তথ্য জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা।
শনিবার দুপুরে ‘নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে নিয়ে ২৩-২৯জুলাই জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের এনেক্স ভবনের সম্মেলন কক্ষে রাঙামাটি মৎস্য অধিদপ্তরের আয়োজন করে এই মতবিনিময় সভার।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৎস্য সম্পদের উন্নয়নে ২০২০সালের মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি(একনেক) এর সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প পাশ হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৮ কোটি টাকা কিন্তু চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের দুই বছরে খরচ হয়েছে প্রায় ১০কোটি টাকা। এতে প্রকল্পটির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াছিন জানান পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে প্রদর্শনী খামার স্থাপন, ক্রিক বা খাচায় মাছ চাষের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, এই প্রকল্পের বরাদ্দ ১১৮কোটি টাকা। কিন্তু চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের দুই বছরে খরচ হয়েছে মাত্র ১০কোটি টাকা। এতে প্রকল্পটির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২০-২১ অর্থ বছরে এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে তিন কোটি ৮৪ লক্ষ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থ বছরে ব্যয় করা হয়েছে ৬ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। বাকি অর্থ প্রকল্পের সামনের অর্থবছরগুলোতে সমন্বয় করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি আরো বলেন, রাঙামাটিতে বর্তমানে ১০৯০টি ক্রিকে মাছ চাষ হচ্ছে। এতে প্রতিবছর ৫৬১ মেট্রিকটন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। জেলার বাঘাইছড়িতে এই ক্রিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের সংখ্যা বেশি।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন বোর্ড (বিএফডিসি) রাঙামাটি বিপণন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত, বংশবৃদ্ধি এবং মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য প্রতিবছর ১লা মে থেকে ৩১জুলাই পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। গত কয়েকবছর ধরে প্রয়োজনের তুলনায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত না হওয়ায় আমাদের আরো বেশি সময় হ্রদে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদে মাছের প্রজনন থেকে বৃদ্ধি সবকিছুই হয় প্রাকৃতিকভাবে। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং পলি জমে মাছের প্রজনন কেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক ¯্রােত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে মাছের উৎপাদন কমছে। তবে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে মাছধরা বন্ধকালীন আমরা মাছের পোনা হ্রদে অবমুক্তকরণের হার বাড়াচ্ছি। হ্রদের প্রজনন কেন্দ্রগুলো খনন প্রয়োজন। মৎস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে খাঁচায় মাছ চাষের জন্য কেউ মৎস অধিদপ্তরে আসলে তাদের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষেত্র বিশেষ ধরনের উন্নত জাতের পোনা ও খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) রাঙামাটি নদী উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিপন মিয়া জানান, কাপ্তাই হ্রদে প্রতিটি মা মাছ থেকে সর্বনি¤œ ১হাজার মাছ পাওয়া সম্ভব, কিছু কিছু মাছের ক্ষেত্রে ডিমের এক শতাংশ যদি পোনা হয় তাহলেও এক লক্ষ পর্যন্ত মাছ পাওয়া সম্ভব। যার কারণে মা মাছ রক্ষায় বিশেষ করে বন্ধকালীন সময়ে মাছ রক্ষায় সকলকে সচেতন হতে হবে।
সপ্তাহব্যাপী জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২২ উপলক্ষে ২৩ জুলাই সাংবাদিকগণের সঙ্গে মতবিনিময় সভাসহ মাইকিং ও ফেস্টুনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা কার্যক্রমের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দ্বিতীয় দিন প্রান্তিক পর্যায়ের মৎস্যচাষী ও মৎস্যজীবিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা এবং জেলা মৎস্য অফিস প্রাঙ্গণ ও পৌর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মৎস্য সেক্টরে বর্তমান সরকারের অগ্রগতি ও সাফল্য বিষয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সপ্তাহের তৃতীয় দিনে জেলার সকল অংশীজনের সমন্বয়ে বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন, পোনামাছ অবমুক্তকরণ, সুফলভোগীদের মাঝে মৎস্য উপকরণ বিতরণ, মতবিনিময় সভা ও সফল মৎস্যচাষীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
৪র্থ দিনে অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা, ৫ম দিনে মৎস্যচাষীদের মৎস চাষ বিষয়ক পরামর্শ সেবা প্রদান, পুকুরের মাটি ও পানি পরীক্ষা। ৬ষ্ঠ দিনে সুফলভোগীদের প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ। ৭ম দিনে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের মূল্যায়ন ও সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই সকল আয়োজনে সকলের আন্তরিক উপস্থিতি কামনা করেন এই কর্মকর্তা।
