॥ ললিত সি. চাকমা ॥
আষাঢ়ের শুরু; বৃষ্টি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে বিরামহীন, আঝোরধারায় বৃষ্টি! এটা অস্বাভাবিক। অন্তত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাবের এ যুগে। রাঙামাটিতে এরকম বৃষ্টি, হয়তো এর চেয়েও বেশি পড়েছিল ২০১৭ সালে এবং সে সময় স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধস ঘটেছিল যার ফলাফল এখনও ভোগ করছে পাহাড়বাসী। পাহাড়ের মাটি চাপায় ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল রাঙামাটিতেই সে পাহাড় ধসের ঘটনায়!
এরকম টানাবৃষ্টির অভিজ্ঞতা হয়েছিল ছোট বেলায়; শৈশব এবং কৈশরে। বড় হওয়ার পর খুব কম দেখেছি এমন বৃষ্টি। তখনকার সময়ে এতো বেশি বৃষ্টি হতো যে, চড়াতে যেতে না পারার কারণে ঘরের গরুগুলোকে উপোষ রেখে গোয়ালে রাখতে হতো। ‘হালপালানি’র ডর’ বলে গ্রামে তখন একটা কথা প্রচলিত ছিল। সে ‘ডর’ মানে অঝোর ধারার বৃষ্টি শুরু হলে আমাদের গ্রামের অনেকের ঘরে খাদ্যভাব দেখা দিতো। বাজার সওদা করার অভাবে মানুষের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দিতো। স্কুলে যাওয়াতো দুরের কথা! খাল-বিল মাড়িয়ে ভরা পানি ডিঙিয়ে ছোট-বড় বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না! ফলে স্কুলগুলোতে ঘটে যেতো এক ধরণের অঘোষিত ছুটি। অতি বৃষ্টিতে কৃষকের ফসলের ক্ষেত মরে যেতো নির্বিচারে। ফলে একধরণের অর্থ মন্দাভাব চলে আসতো গ্রামবাসীদের যাপিত জীবনে। এমন সময়গুলোতে ভয়-ডর পরিত্যাগ করে অপেক্ষাকৃত যুবদের রাঙ্গুনিয়া, রাউজানের সমতলীয় দূর গ্রামগুলোতে গিয়ে বস্তাভর্তি ব্যাঙ ধরে নিয়ে আসার কর্মকান্ড চলতো ঘরে ঘরে।
এভাবেই দেখেছি অতিবর্ষণের সময়গুলো অতিবাহিত করতে। মাঝে মাঝে দূর থেকে দু’একটি আতঙ্কিত হওয়ার মতো খবর কানে আসতো যে, ‘অমুক গ্রামে পাহাড় চাপা পড়ে অমুক কিংবা এতো জন মারা গেছে’ এমন সব খবর। তবে আমাদের গ্রামে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জীবনে শুনিনি।
বানের পানির কবলে পড়ে বানভাসি হয়েছে সুনামগঞ্জ ও সিলেটের জনপদ। বাবা শাহজালালের পূণ্যভূমি সিলেট অঞ্চলের মানুষের এমন জনদুভোর্গ সত্যিই অসহনীয়! আশার কথা হলো সিলেট শহরের পানি কমতে শুরু করেছে; ফেসবুকের এক বন্ধুর স্ট্যাটাস থেকে অন্তত আশ্বস্ত হওয়ার মতো খবরটা কিছুক্ষণ আগে জানা গেলো। ঢলের পানি হয়তো দ্রুত সরে যাবে কিন্তু বানের প্রভাবে সৃষ্ট জনদুর্ভোগের রেষ থামাতে হয়তো মাস খানেকও লেগে যেতে পারে। এদিকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি থেকেও খবর আসছে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার কথা। এভাবে পুরো দেশজুড়ে কমবেশি দুর্যোগ ঘটেই চলেছে বলে আমার অনুমান। এমন পরিস্থিতিতে কেবল ‘মহান আল্লাহ সহায় হও’ বলে হাত উঁচু করে প্রার্থনা করে গেলে চলবে না। দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে সরকারসহ সকলকে এগিয়ে আসতে হবে একযোগে। সিলেটের বানভাসি মানুষকে উদ্ধারে নেমেছে আমাদের সেনাবাহিনী; এটি আশাবাদী হওয়ার খবর। সেনাবাহিনী শুধু যুদ্ধে নয়; দুর্যোগেও চ্যালেঞ্জ নেয় জাতির প্রয়োজনে। আরও দু’একদিন টানা বৃষ্টির ধারা অব্যাহত থাকলে আমাদের ভাগ্যে কি ঘটবে জানা নেই। তবে আমাদের মতো নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারসমূহে খাদ্য সংকট হবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এহেন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে সরকারের কাছে নিবেদন, সর্বশক্তি দিয়ে বিপদাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ান। মানুষ আপনাদের কর্মের কথা ভুলবে না আমার বিশ্বাস। প্রয়োজনে পদ্মাসেতু উদ্বোধনের বাজেট হ্রাস করে সে অর্থ বিপদাপন্ন মানুষের সাহাযার্থে খরচ করুন। পদ্মাসেতু নির্মাণের কৃতিত্ব যে শেখ হাসিনার সরকারের সে কথা এখন মায়ের পেটের বাচ্চাটিও জানে। কাজেই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পদ্মাসেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে জমকালো অনুষ্ঠান দেখিয়ে দেশে-বিদেশে হাততালি কুড়ানোর বাস্তবতা এখন দেশবাসীর নেই। দেশের মানুষের জীবন বাঁচানোটিই এখন সরকারের কাছে ফরজ।
লেখক: পর্যটন উদ্যোক্তা
