প্রান্ত রনি ॥
শুষ্ক মৌসুমে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি কমতে থাকায় জেগে ওঠে ছোট-ছোট চর বা জমি। জেগে ওঠা এসব জমিতে পানি কমতে শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বোরো আবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়েন স্থানীয় কৃষকরা। তবে চলতি বছর কাপ্তাই হ্রদের পানি বিলম্বে কমার কারণে বোরো আবাদও কিছুটা বিলম্বে শুরু হয়েছে। এতে করে ফসল উৎপাদনের নির্ধারিত সময়ে বৃষ্টিপাত ও কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়লে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি বোরো মৌসুমেই ১৫ নভেম্বর থেকে কাপ্তাই হ্রদের বিস্তীর্ণ জলে ভাসা জমিতে রোবো আবাদের জন্য বীজতলা তৈরির কাজ শুরু হয়। এরপর বীজতলা তৈরি থেকে রোপণ, পরিচর্যা ও ফলন ঘরে তুলতে সময় লাগে ১৫০-১৫৫ দিন। এক্ষেত্রে যে সকল কৃষকগণ দেরীতে বীজতলা তৈরি করে থাকেন, তাদের সফল তুলতেও বিলম্ব হয়ে থাকে। এতে করে শুষ্ক মৌসুম শেষে কাপ্তাই হ্রদে পানির বাড়তে শুরু করলে নির্ধারিত সময়ের ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চলতি মৌসুমে এপর্যন্ত জেলার আট উপজেলায় ২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। রাঙামাটি জেলা সদর, কাপ্তাই, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকল, লংগদু, বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর ও খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার কিছু অংশে জলে ভাসা জমিতে চাষাবাদ হয়ে থাকে। মৌসুমের ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত বোরো ধানের বীজতলা তৈরি ও রোপণের সময় থাকে।
রাঙামাটি জেলা শহরের রাঙাপানি এলাকা; পাকা সড়কের দু’পাশেই বিস্তীর্ণ কাপ্তাই হ্রদ। শুষ্ক মৌসুমে হ্রদের পানি কমতে শুরু করলে ভেসে ওঠা জমিতে বোরো ধান আবাদ করে থাকেন স্থানীয় অধিবাসীরা। এই পদ্ধতিকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘জলে ভাসা’ জমি আবাদ। পুরো এলাকার অর্ধশতাধিক কৃষক জলে ভাসা জমিতে ধান আবাদ করে থাকেন। কৃষকরা জানায়, চলতি মৌসুমে হ্রদের পানি দেরীতে নামার কারণে বোরো আবাদেও কিছুটা সময়ক্ষেপণ হয়েছে। যে কারণে মৌসুমের শেষের দিকে ফসল ঘরে তোলা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।
রাঙাপানি এলাকার কৃষক নিলু কুমার চাকমা জানান, প্রতি বছর কাপ্তাই হ্রদের পানি কমতে শুরু করলে সাধনাপুর এলাকার অর্ধশতাধিক কৃষক জলে ভাসা জমিতে রোবো আবাদ করে থাকেন। অনেকেই উঁচু জমিতে আরো দু’মাস আগে থেকে বোরো আবাদের জন্য বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন। বেশিরভাগ কৃষকই জমিতে ধান রোপণের কাজ শেষ করেছেন। স্বল্প পরিমাণ জমি এখনো আবাদের বাকী রয়েছে। তিনি বলেন, এই এলাকার কৃষকদের বোরো ধানে সেচ ব্যবস্থাপনার সংকট দীর্ঘদিনের। শুরুর দিকে পানিতে ধান রোপণ করতে পারলেও চারার বয়স বাড়তে বাড়তে সেচের পরিমাণ হয়। কিন্তু সেচ ব্যবস্থাপনার সুযোগ না থাকায় ধানের চারা মরে যায়, পাতা লালচে রঙ ধারণ করে। যে কারণে মৌসুম শেষে কৃষকরা কাক্সিক্ষত ফলন পাচ্ছেন না। এখনকার কৃষকের সেচের দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের; আমরা এর থেকে পরিত্রাণ চাই।
একই এলাকার কৃষাণী তোক্ষবধি চাকমা বলেন, একেতো এখন করোনাকাল। মানুষের হাতে টাকা পয়সাও নেই। এরমধ্যে সার, ওষুধ, কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি। আবার পানির সমস্যা তো বড় সমস্যা। এখন সেচের পানি নেই; আবার পরে বৃষ্টি শুরু হলেও ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। এতো সমস্যা নিয়েই আমাদের কৃষিকাজ করতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে যদি আমাদের সার, ওষুধের জন্য কোন সহায়তা দেয়া যায় তাহলে অনেক ভালো হতো। জিন্দাধন তঞ্চঙ্গ্যা নামে আরেক কৃষক বলেন, অনেক সময় কৃষকরা একটু দেরিতে আবাদ করলে লেকের পানির বাড়ার কারণে ফলন পানিতে তলিয়ে যায়। এজন্য আগাম বোরো আবাদ করতে হয়। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে অনেক কৃষিই নির্ধারিত সময়ে বোরো আবাদ করতে পারেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙামাটি জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ তপন কুমার পাল বলেন, রাঙামাটির দশ উপজেলায় ৭ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখজনক একটা অংশ হলো জলে ভাসা জমিতে রোবো আবাদ। জেলার রাজস্থলী ও কাউখালী উপজেলা ব্যতিত বাকী আট উপজেলাতে কমবেশি বোরো আবাদ হয়ে থাকে। এ পর্যন্ত আট উপজেলার ২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ১৫ মার্চ পর্যন্ত আবাদ করা যাবে। তখন কী পরিমাণ জলে ভাসা জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে সেটি নিশ্চিত করে বলা যাবে।
কৃষকদের কেমন সহায়তার আওতায় আনা হচ্ছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তপন কুমার পাল জানান, আমরা মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের বোরো ধান আবাদের জন্য সকল কারিগরি সহায়তা করে থাকি। রাঙামাটিতে দুই প্রজাতির ধানের আবাদ হয়ে থাকে। একটি উফসী বা উচ্চফলনশীল (ইনব্রিড) জাত; আরেকটি হলো হাইব্রিড বা সংকরজাত। এক্ষেত্রে আমরা কৃষকদের উফসীজাতের ধান আবাদের জন্য উৎসাহী করছি। যাতে করে প্রতিবছরই এই জাতের ধান সংরক্ষণ করে কৃষকরা চাষাবাদ করতে পারেন। এতে করে প্রতি বছর অধিক দামে হাইব্রিড জাতের ধানবীজ ক্রয় করতে হবে না। আর্থিকভাবে তারা আরো লাভবান হবেন।
এদিকে ডিএই রাঙামাটি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক জানান, জলে ভাসা জমিতে চাষাবাদ হলো অনিশ্চিত ফসল। কাপ্তাই হ্রদের পানি ধীরলয়ে কমার কারণে এবছর ফসল আবাদেও বিলম্ব হচ্ছে। এজন্য কালবৈশাখী ঝড় বা বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত যদি একটু দেরিতে হয় তাহলে ফসল ঘরে তোলা যায়। তবে বৃষ্টিপাত তাড়াতাড়ি শুরু হলে হ্রদের পানি বাড়তে থাকলে অনেকেই শেষের দিকে ফসল ঘরে তুলতে পারেন না। এক্ষেত্রে একটু আগাম সময়ে ফসল আবাদ করতে পারলে ভালো। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে বৃষ্টিপাত ও কালবৈশাখীর কারণে অনেক কৃষকই নির্ধারিত সময়ে ফসল ঘরে তুলতে পারেননি।
