সুহৃদ সুপান্থ
ভোটে জেতার বা জেতানোর অভ্যাস তার পুরনোই। কখনো অগম্য পথ ডিঙ্গিয়ে জিতেছেন নিজে,আবার কখনো স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিনিয়ে এনেছেন বিজয়। আবার বিজয়ের পর বিজয়ীর ‘অন্য চেহারা’ও সম্ভবত সবচে বেশি দেখেছেন তিনিই। যাদের জন্য নানা কিছু করে বিতর্কিত হয়েছেন নানান সময়,তারাই মুহুর্তেই চোখ উল্টিয়েছে বারবার। কিন্তু তবুও তিনি নির্বিকার,নৌকা কিংবা দলের সমর্থিত প্রার্থী, প্রতীকের নির্বাচন কিংবা সামাজিক সংগঠনের নির্বাচন,সর্বত্রই বড় বেশি ‘একরোখা’ ‘সোজাসাফটা’ ‘বুনো’ তিনি জিততে ও জেতাতে। তিনি মুছা মাতব্বর। রাজনীতির সব অর্জন যার ফুলের ঢালা হয়েই ফিরে ফিরে এসেছে দূয়ারে,ভালোবাসা হয়ে।
ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস অতটা বর্ণাঢ্য নয় তার। তবে ছাত্রলীগই করেছেন,আপাদমস্তক। পারিবারিক এবং ব্যবসায়িক,দুই জীবনেই সফল এই মানুষটি প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সবাইকে চমকে দিয়ে বহু হেভিওয়েট এর ভাবনার বৃত্তের বাইরে গিয়ে হয়ে গেলেন রাঙামাটির সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ! গাছ ব্যবসায়ি ও দানবীর হিসেবে পরিচিত মাতব্বর পরিবারের ‘ আয়েশী’ সদস্যটি মুহুর্তেই হয়ে গেলেন জনপ্রতিনিধি। সেই শুরু তার অর্জনের ছুটে চলা। সেই সময়কার দৃশ্যত ‘ঠুটো জগন্নাথ’ উপজেলা চেয়ারম্যান পদে থেকে যেনো তর সইছিলো না। এরই মধ্যে চলে আসে জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন। কি আশ্চর্য,সেই সময় সবাইকে চমকে দিয়ে, খোদ দীপংকর তালুকদারের প্রার্থী ‘হাজী কামাল’কে কাউন্সিলে ভোটে পরাজিত করে দলের সাধারন সম্পাদক হয়ে যান মুছা মাতব্বর। রাজনৈতিক উত্থানের সেই শুরু তার। দায়িত্ব পাওয়ার প্রথম দিকে ‘অভিমানী দীপংকর’র সাথে খুব একটা নৈকট্য ছিলোনা তার,কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে,রাজনীতির ‘নিপাট শিক্ষক’ দীপংকর যেনো জহুরি চিনতে ভুল করেননি। যোগ্যতার চেয়েও প্রয়োজনকে কখনো কখনো খুব বেশি যে মনে ধরে,তারই প্রমাণ যেনো এককালের দীপংকর-মুছার টানাপোড়েনের সম্পর্কের ‘প্রগাঢ় আস্থা আর বিশ্বাসের সম্পর্কে’ পরিণত হওয়ার গল্প।
সাধারন সম্পাদক হয়ে মুছা মাতব্বরের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিলো বিএনপির জনপ্রিয় মেয়র সাইফুল ইসলাম ভূট্টোকে পরাজিত করা। একেবারেই অনালোচিত কিন্তু তৃণমূল থেকে উঠে আসা যুবলীগ সভাপতি আকবর হোসেন চৌধুরীকে যেনো ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে নিয়ে মাঠে নেমেছে আওয়ামীলীগ ও মুছা মাতব্বর। কি করেননি তিনি ? আকবরকে জেতাতে ‘যা যা করা সম্ভব’ তার সবই করেছেন তিনি ২০১৫ সালের সেই পৌর নির্বাচনে। এমন অনেক কিছুই করেছেন,যা বৈধতা ও নৈতিকতার মানদন্ডেও সমর্থন পায়নি অনেকের। এমনকি যে রিজার্ভবাজারে এককালে আওয়ামীলীগের ভোট মানেই ছিলো শুধুই সংখ্যালঘুর ভোট,সেই রিজার্ভবাজারকে নৌকার ভোট ব্যাংকও জানিয়েছেন তিনি ‘ছলে বলে কৌশলে’। সেই সব কাজের ফল হাতেনাতে পেয়ে মেয়র হয়েছেন আকবরই। কিন্তু বিধি বাম। নিয়তির কি অদ্ভূত গতিপথ। যে আকবরের জন্য সবচে বেশি ‘বিতর্কিত ও সমালোচিত’ হয়েছেন মুছা,সেই আকবরের সাথে তার সম্পর্ক ‘খুব ভালো’ আর হলোনা কোনদিনই। প্রকাশ্যে যতই ‘হাসিখুশি’ ছড়ান দুজনে,ভেতরে ততবেশি ‘তুষের আগুণ’ও পুষে বেড়ান পরষ্পরকে ভষ্ম করে দিতে ! তারই ফল হিসেবে আকবেরর দ্বিতীয়বার মনোনয়ন পেতে প্রবল বিরোধীতায় মাতেন তিনি,চেষ্টাও করেন হাবিবুর রহমানকে দিয়ে,কিন্তু নানা কারণে সেটি সম্ভব না হওয়ায় নির্বাচন থেকে নিরাপদ দূরত্বে চলে যান এবং পরে কেন্দ্রের চাপে সামিল হোন নির্বাচনে,প্রচারে নামেন। বিজয়ী হোন আকবর। কিন্তু রাঙামাটি শহরে এমন একজন মানুষও পাওয়া যাবেনা,যিনি বিশ্বাস করেন আকবর এবং মুছার সম্পর্ক ‘বেশ উঞ্চ’ !
আকবরকে বিজয়ী করার পর রেডিক্রিসেন্ট নির্বাচনে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মাহফুজুর রহমানকেও এমন সব কৌশল ব্যবহার করেন,যা মুছাকে বিতর্কিত করলেও বিজয়ী হন মাহফুজ এবং প্রথমবারের মতো রাঙামাটি রেডক্রিসেন্টে শুরু হয় দলীয় সমর্থনে সেক্রেটারি হওয়ার জমানা। প্রথমবার মাহফুজকে সেক্রেটারি বানানোর পেছনেও ছিলো তারই অবদান। সেই মাহফুজের সাথেও সম্পর্ক একই তালে পরে আর এগোয়নি। টানা দ্বিতীয়বারের সেক্রেটারি হওয়া মাহফুজের পরের নিবার্চনে তাই শুরুতে মাঠে ছিলেন না তিনি। যদিও পরে সম্পৃক্ত হন দলীয় বাধ্যবাধকতায়।
রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলনে সভাপতি হওয়া আব্দুল জব্বার সুজন মূলত: প্রধানত এবং একমাত্র পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরীর সমর্থক হলেও সেই সম্মেলনে সুজনের সভাপতি হওয়ার পেছনে অন্যতম কূশলী ছিলেন মুছা মাতব্বর। কাউন্সিল ছাড়াই ঘোষিত এই কমিটির সভাপতি সুজনের ‘নানা’ হিসেবে পরিচিত মুছার সাথে পরে আর সম্পর্ক এক সুতোয় এগোয়নি সুজনের। আকবর-মুছা সম্পর্কের টানাপোড়েনে আকবরের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় সুজন ও তার অনুসারিরা। যদিও পরে বাঁক বদলে সুজনের এককালের সবচে ঘনিষ্ঠ সহচর সুলতান মাহমুদ বাপ্পা এখন মুছার ‘কাছের মানুষ’।
রাঙামাটি সদর উপজেলায় মুছা উত্তরকালে আর জেতেনি আওয়ামীলীগ। এই হারানো পদটি ফিরে পেতে মরহুম হাজী মহসীনের পুত্র ও বহুদিন ধরেই রাজনীতির বাইরে থাকা শহীদুজ্জামান রোমানকে দলীয় প্রার্থীতা পাইয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মুছাই। রোমানকে স্বেচ্ছাসেবকলীগের সহসভাপতি করা থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা মুছা মাতব্বরেরই। একসময় বড্ড ঘনিষ্ঠ ‘মুছা-রোমান’ সম্পর্ক নিয়ে এখন নানা কথাই শোনা যায় বাতাসে,টানাপোড়েনের,ক্ষোভ-আক্ষেপের! যদিও সবই ভেসে বেড়ানো গল্পই হয়ত,এর সত্য মিথ্যা কোনটাই জানা ‘প্রায় অসম্ভব ’।
সাধারন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর গত আট বছরে মুছার হাত ধরে রাঙামাটি ও বাঘাইছড়ি পৌরসভায় দলীয় প্রার্থীদের জয়, উপজেলা চেয়ারম্যান পদে দলের প্রার্থীদের সাফল্য, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভালো ফলাফল মুছার রাজনৈতিক সাফল্যের পালকে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। একসময় নিজে বিজয়ী হতে ভূমিকা রেখেছেন প্রানপন এমন অনেক প্রার্থীই জয়ের পর চোখ উল্টিয়েছে, তাতে কষ্ট পেয়েছেন,অভিমান করেছেন মুছা,কিন্তু ঠিকই শেষাবধি তার জন্যই আবারো নেমেছেন ভোটের মাঠে, এমন উদাহরণ অজস্র।
সেই মুছা এবার কঠিন যুদ্ধে নেমেছেন,ফের আরেকবার। লংগদু উপজেলায়। কোন্দল-গ্রুপিং আর স্বজনপ্রীতিতে বিপন্ন সেই উপজেলার আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নানাভাবে ভূমিকা রাখছেন মুছা। কখনো কঠোর,কখনো কোমল আচরনে পরষ্পর বিরোধী গ্রুপগুলোকে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছেন। এখন দীপংকর তালুকদারের সবচে আস্থাভাজন এই নেতা সোমবার লংগদুর প্রভাবশালী দুইনেতাকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত দিয়ে বুধবার সেখানে গিয়েই সেই দুই নেতার স্বজনকে নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়াতে ‘অনেকটা বাধ্যই করেছেন,পরিস্থিতির চাপে ফেলে’। শুধু তাই নয়, জানিয়েছেন,নির্বাচনী প্রচারণার শেষদিন পর্যন্ত তিনি লংগদুতেই থাকবেন।
মুছা মাতব্বর বলছেন-‘ আমি দল করি,দলের জন্য। আমার নেত্রী শেখ হাসিনা। নৌকা ও দলের কারণে আমার একেবারে অপছন্দের ব্যক্তি ও প্রার্থীর পক্ষেও কাজ করে জিতিয়েছি বারবার। এখনো লংগদুতে পড়ে আছি দলীয় প্রার্থীদের জন্যই। আমার বিশ্বাস লংগদুর মানুষ আমাকে নিরাশ করবেন না। এখানে সাতটি ইউনিয়নেই বিজয়ী হবে নৌকা।’
দূরের লংগদু থেকে শহর রাঙামাটিতে ইথারে ভেসে আসা মুছার কন্ঠস্বরে প্রবল আত্মবিশ্বাস। বাইরের কনকনে শীত উপেক্ষা করেও মাঝবয়সী মুছা ছুটে বেড়াচ্ছেন নৌকাকে জেতাতে লংগদুর প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বরাবরই ‘জটিল এবং কূটিল’ রাজনীতির জন্য আলোচিত লংগদুতে ‘নৌকার প্রার্থীদের ‘শেষ হাসি’ মুছা হাসাতে পারবেন কিনা,সেটা সময়ই হয়ত বলে দেবে। লংগদু আওয়ামীলীগের বহুদাবিভক্ত ‘অসুখী সংসারে’ ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কতটা সুখের পরশ ছোঁয়াতে পারবেন রাঙামাটির এক মাতব্বর সে হয়ত সময়ই বলে দেবে !
কিন্তু দিনান্তের শত প্রতিকূলতা, বিজয়ের পর বদলে যাওয়া সহযোদ্ধাদের মুখ, নিজের কঠোর বৈরি সব প্রতিপক্ষ কিংবা অজ¯্র অপমান গঞ্জনা অপবাদ সয়েও যেভাবে এখনো ছুটে বেড়াচ্ছেন দলের প্রার্থীকে জেতাতে একজন মুছা,সেই ঈর্ষনীয়ই বটে ! রাজনীতি হয়তো একারণেই এখনো এত সুন্দর !
