শ্যামল রুদ্র, রামগড় ॥
খাগড়াছড়ির রামগড়ে অবাধে চলছে পাহাড় কাটা, মাটি পাচার ও বালু উত্তোলন। পাহাড় খেকো চক্র নির্বিচারে কাটছে পাহাড় ও বনাঞ্চল এবং ফসলি জমির টপসয়েল। অতি শক্তিসম্পন্ন ড্রেজিং মেশিন দিয়ে নদী, ছড়া ও খাল থেকে উত্তোলন করছে বালু। পাহাড় কাটার এ উৎসব মূলত শুরু হয় অবৈধ ইটভাটাগুলোতে মাটি সরবরাহ করতে। তবে অনেক সময় সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের অজুহাতে পাহাড় কেটে চলেছে অশুভ চক্রগুলো। এ অবৈধকাজে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন কতিপয় স্থানীয় নেতা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলনের অপরাধে জরিমানা করলেও থেমে নেই এ অশুভ তৎপরতা। এতে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে।
জানা যায়, রামগড়ে সোনাইআগা খাল এবং তৈছালা ছড়া এই ২টি জায়গায় মাটি ও বালু উত্তোলনের ইজারা দেওয়া হয় সরকারিভাবে। অথচ রামগড়ের বিভিন্ন জায়গায় অন্তত ৩০টি পয়েন্টে এস্কেভেটর এবং ড্রেজিং মেশিন ব্যবহার করে নির্বিচারে মাটি ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বালু ও মাটি পরিবহনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে ট্রাক ও পিকআপ। কয়েকজন স্থানীয় নেতার ছত্রছায়ায় পাহাড়-টিলা ধ্বংস করা হচ্ছে। রাস্তা মেরামতসহ নানা অজুহাতে কাটা হচ্ছে পাহাড়-টিলা।
পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন খাগড়াছড়ির সাধারণ সম্পাদক আবু দাউদ বলেন, একদিকে প্রশাসনের উদাসীনতা অন্যদিকে পাহাড়খেকো দুষ্টচক্রের দৌরাত্ম্যে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। এইসব অপতৎপরতা বন্ধে প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের সত্যিকারের সক্রিয়তা জরুরি।
সরেজমিনে জানা যায়, রামগড়ের পাতাছড়া, বলিপাড়া, চিনছড়ি পাড়া, বৈদ্যটিলা, কালাডেবা, সোনাইআগা, খাগড়াবিল, শ্মশানটিলা, নজিরটিলা, ব্রতচন্দ্র পাড়াসহ বিভিন্ন জায়গায় অন্তত ৩০টি পয়েন্টে নির্বিচারে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। এস্কেভেটর দিয়ে ফসলি জমির টপসয়েল ও লাল মাটির পাহাড় কাটা হচ্ছে। ফলে পাহাড়ের ওপরের অংশ ন্যাড়া হয়ে উজাড় হচ্ছে গাছপালা। অপরদিকে কৃষি জমি ও খাল থেকে পানির পাম্প দিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। তাছাড়াও উপজেলার অসংখ্য পয়েন্টে ড্রেজিং ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবাধে বালু তুলছেন ব্যবসায়ীরা। এসব মাটি ও বালু অবৈধ ইটভাটা, পুকুর ভরাট, রাস্তা সংস্কারসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহৃত হয়।
রামগড়ের নজির টিলা এলাকায় পাহাড়ের ওপর পরিবার নিয়ে থাকেন জসিম উদ্দীন নামের এক ব্যক্তি। দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে নিজের ভিটের মাটি বিক্রি শুরু করেন তিনি। খবর পেয়ে পাহাড় কাটার অপরাধে সম্প্রতি তাকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করে উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয়রা জানান, রামগড়-ফেনী সড়কসহ উপজেলার প্রতিটি অলিগলি যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। ইট ভাটার ব্যবহারের জন্য ডাম্পার, ট্রাক নষ্ট করছে সড়কগুলো। চরম জনদুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছেন এলাকাবাসী।
রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ভারপ্রাপ্ত) উম্মে হাবিবা মজুমদার এই প্রসঙ্গে বলেন,খবর পেলেই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গত ১৪ জানুয়ারি রামগড়ের বৈদ্যটিলায় পাহাড় কাটার অপরাধে রকিবুল ইসলাম রকি নামের এক ব্যবসায়ীকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মুফিদুল আলম বলেন, পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ড বন্ধে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয় না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে দেখভাল করা হয় পাহাড়ের বিষয়গুলো। পাহাড় ও টপসয়েল কাটা এবং যত্রতত্র বালু উত্তোলন, বনের কাঠ জ্বালানো এসবই অনৈতিক-অবৈধ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
