শ্যামল রুদ্র, রামগড়
খাগড়াছড়ির রামগড়ে অবৈধভাবে বেশ কয়েকটি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। নেই পরিবেশ অধিপ্তরের ছাড়পত্র। পাহাড়ি এই উপজেলায় অন্তত ১০টি অবৈধ ইটের ভাটা রয়েছে। কয়লার পরিবর্তে এখানে পোড়ানো হচ্ছে বনের কচিকাচা গাছ। নষ্ট হচ্ছে সড়ক এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয়রা। কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এসব ইটভাটা গড়ে তোলা হলেও নিষ্কিয় ভূমিকায় রয়েছে প্রশাসন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রামগড় পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ড সোনাইপুলেই রয়েছে ৪টি অবৈধ ইটের ভাটা। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী পৌর এলাকার অভ্যন্তরে ও কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন করা যায় না। কর্তৃপক্ষ এই এলাকায় ইটভাটা স্থাপনের জন্য কোনো লাইসেন্সও দিতে পারে না। এসব নিয়ম লঙ্ঘন করেই ইটভাটাগুলোর কার্যক্রম চলছে। আধাকিলো মিটারের ব্যবধানে প্রায় ৮০ কানি জায়গাজুড়ে নুরজাহান ব্রিকস, হাজেরা ব্রিকস, মোস্তফা রাইটার্স ব্রিকস ও এনআইএম ব্রিকস নামে চারটি ভাটা গড়ে তোলা হয়েছে।
রামগড়ের নাকাপা পুলিশ ফাঁড়ি থেকে আনুমানিক ৩ কিলোমিটার ভেতরে রামগড় ২নং পাতাছড়া ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা দাঁতারামপাড়ায় এক সঙ্গে (মেঘনা ব্রিকস-১, মেঘনা ব্রিকস-২, আপন ব্রিকস-১, আপন ব্রিকস-২ ও এমএসপি ব্রিকস) ৫টি অনুমোদনহীন ইটের ভাটার গড়ে উঠেছে। পাহাড়ে ঘেরা জনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় ইটের ভাটা তৈরিতে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে জনজীবন। অনুমোদনহীন ইটভাটাগুলোতে দেদারছে পোড়ানো হচ্ছে হচ্ছে বনের কাঠ। আইন উপেক্ষা করে লোকালয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়কারী এসব ভাটা। প্রতি মৌসুমে একটি ইট ভাটায় গড়ে ১লাখ মন কাঠ পুড়ে। ১০টি ইটভাটায় অন্তত ১০লাখ মণ কাঠ পোড়ানো হয় জানায় সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, এসব কাঠ জোগাড় হচ্ছে আশপাশের বনাঞ্চল থেকেই। যার ফলে উজাড় হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি বনাঞ্চল, বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে পাহাড়। পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন স্বত্ত্বেও অবৈধভাবে ইটভাটাগুলোতে পাহাড়ি কাঠ পুড়ানো হচ্ছে।
সম্প্রতি এসব এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অবৈধ ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর তেলের ড্রাম চিমনি। পুড়ানোর জন্য জমা করা হচ্ছে বনের বিপুল পরিমাণ গাছ। ডাম্পার এবং মিনিট্রাক ব্যবহার করে মাটি, কাঠ এবং ইট পরিবহন করায় সড়কগুলোতে বড় আকারের গর্ত এবং ধুলাবালির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড় কেটে আনা মাটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রামগড়-খাগড়াছড়ি সড়ক হতে দাঁতারাম পাড়া পর্যন্ত কাঁচা রাস্তাটি ভাটার মৌসুমে মরণ ফাঁদে পরিণত হয়। বিভিন্ন ইটভাটায় ব্যবহারের জন্য ডাম্পার, মিনিট্রাক দ্বারা সরবরাহ করা কাঠ, মাটি রাস্তায় পড়ে নষ্ট হয়ে যায় সড়কটি।
দাঁতারাম পাড়া এলাকার বাসিন্দা কমল কান্ত জানান, এসমস্ত ইটভাটায় কাঠ, মাটি এবং ইট কেনা বেঁচায় ভারি যানবাহন ব্যবহার করার ফলে রাস্তাটির বেহাল দশা সৃষ্টি হয়েছে। মাটি, কাঠ এবং ইট পরিবহনের ক্ষেত্রে ডাম্পার এবং মিনি ট্রাক ব্যবহারের ফলে রাস্তার ওপর মাটি পড়ে রাস্তাটি দিনের পর দিন নষ্ট হচ্ছে এবং সামনে বৃষ্টির মৌসুমে এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। ধুলাবালিতে জনদুর্ভোগে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ।
হাজেরা ব্রিকস্ এর স্বত্ত্বাধিকারী নোমান ভূইয়া জানান, কয়লার দাম বেশি। এতে তাদের খরচ বেড়ে যায়। এজন্য চুল্লীতে তারা কাঠ পোড়ান। এ বিষয়ে সবাই অবগত আছে বলে জানান তিনি। তবে তিনি দাবি করেন এসব গাছ তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ক্রয় করেন।

রামগড় পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জসিম উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ইটভাটার ধোঁয়ায় জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। সড়ক সংস্কার করলে দুই দিনে সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বিষাক্ত ধোঁয়ায় শিশু ও বয়স্ক মানুষের শরীরের নানা রকম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
সোনাইপুল এলাকার জয়নাল মিয়া জানান, ইট তৈরিতে কতৃর্পক্ষ নিয়মনীতি মানেন না। প্রতিটি ইটের দৈর্ঘ্য ১০ ইঞ্চি করে তৈরির কথা থাকলেও তারা তা মানছেন না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চওড়া দামে বিক্রি করছে এগুলো।
এ ব্যাপারে রামগড় বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা সুলতানুল আজিম জানান, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। সংরক্ষিত বনের কাঠ পোড়ানো হলে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে বন থেকে গাছ কাটা ও চুল্লীতে কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ। কয়লা দিয়ে চুল্লীতে ইট পোড়াতে হয়।
এদিকে, রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার জানান, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। খবর নিয়ে খুব দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
