নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
বনভান্তের উদ্দেশ্যে কল্পতরু ও চীবর দানের মাধ্যমে রাঙামাটির রাজবন বিহারে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী ৪৮ তম দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব। অন্যান্য বছর বেইনঘর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দু’ব্যাপী এই উৎসব শুরু হলেও এবছর করোনা মহামারীর কারণে বেইনবুনা হয়নি। রাঙামাটির রাজবিহারের চীবর দান উৎসবই পার্বত্যাঞ্চলে বৌদ্ধদের বৃহত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব।
শুক্রবার দুপুরে গৌতম বুদ্ধ ও বনভান্তের প্রতিকৃতিতে চীবর দান ও ধর্মীয় দেশনার মাধ্যমে সাঙ্গ হয় এবারের দানোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এ দিন সন্ধ্যায় আকাশ প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও পাহাড়ের সর্ববৃহৎ চীবরদান উৎসবকে ঘিরে লক্ষাধিক দায়ক-দায়িকা, পূণ্যার্থীর সমাগত ঘটেছে পুরো বিহার এলাকাজুড়ে।
শুক্রবার সকালে বুদ্ধ পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এই দিনের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় দেব-মানবের তথা সকল প্রাণীর হিতার্থে ধর্মদেশনা। ধর্মদেশনায় উপস্থিত ছিলেন রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান শ্রীমৎ প্রজ্ঞালঙ্কার মহাস্থবির।
পঞ্চশীল গ্রহণের পর দুপুর আড়াইটায় বনভান্তের মানব প্রতিকৃতির উদ্দেশ্যে কঠিন চীবর উৎসর্গ করা হয়। রাঙামাটি রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞালঙ্কার মহাস্থবিরের হাতে কঠিন চীবরটি তুলে দেন উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সিনিয়র সহ সভাপতি গৌতম দেওয়ান। এসময় উপস্থিত ছিলেন উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা, সাবেক উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান, উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি গৌতম দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক অমিয় খীসাসহ অন্যান্য পুণ্যার্থীগণ।
চীবরদান অনুষ্ঠানে আসা নমিতা চাকমা জানান, ‘আমরা পূর্ণ লাভের আশায় ভান্তেদের উদ্দেশে চীবরদান দান করতে এখানে এসেছি। চীবরদান অনুষ্ঠানে মৈত্রীর সমাবেশ ঘটে।’
তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে আড়ম্বরপূর্ণভাবে রাঙামাটি রাজবন বিহারে প্রতিবছর এ দানোৎসবের আয়োজন করা হয়। এদিকে উৎসব উপলক্ষে রাজবন বিহার এলাকায় বিশাল মেলা বসেছে। মেলা প্রাঙ্গণে সহ¯্রাধিক স্টলে সারাদেশ থেকে কুটির ও হস্তশিল্পের পণ্যের পসরা নিয়ে লোকজন এ মেলায় অংশ নিয়েছে। এছাড়া নাগরদোলাসহ বিভিন্ন খেলা, যাদু প্রদর্শনী, ধর্মীয় পালাকীর্তনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশায় মহাউপাসিকা বিশাখা ২৪ঘন্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা এবং সুতা রঙ করে কাপড় বুনে তা সেলাই করে চীবর (ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্র) দান করে এই কঠিন চীবরদানের সূচনা করেন প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। এই পদ্ধতিতে দান করলে কায়িক, বাচনিক মানসিকভাবে অধিক পরিশ্রম হয় এবং অধিকতর পূণ্যলাভ হয় বলে বৌদ্ধ শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে) ১৯৭৪ সালে রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার তিনটিলা বন বিহারের দায়ক-দায়িকাদের দিয়ে এই কঠিন চীবর দানোৎসবের পুনঃপ্রবর্তন করান।
রাঙামাটি রাজবন বিহারে সর্বপ্রথম কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালে। সেই থেকে প্রত্যেক বছর রাঙামাটি রাজবন বিহারসহ তিন পার্বত্য জেলার রাজবন বিহারের শাখাসমূহে বিশাখা প্রবর্তিত নিয়মে কঠিন চীবর দানোৎসব সম্পাদন করা হয়ে থাকে।
