ঝুলন দত্ত ॥
চাকমা ভাষায় গাছকাবা ছড়া ঝর্ণা, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় গাছ ছোঁয়া ছড়া ঝর্ণা আর অনেকেই চিনে গাছকাটা ছড়া ঝর্ণা নামে। যে যেই নামেই চিনুক না কেন প্রকৃতি দেবী যেন তাঁর আপন মাধুরি দিয়ে সাজিয়েছে এই ঝর্নাকে। পাহাড়ের ১শত ২০ ফুট উঁচু হতে অবিরাম ধারায় যে জল ¯্রােতধারা প্রবাহিত হয়, এই যেন নিচক জলের শব্দ নয়, বরং সুর আর ছন্দ তালে যেনো বেজে আসছে কোন স্বর্গপরীর অপূর্ব সুরধ্বনি। যে সুরের ধ্বনিতে হৃদয়ের প্রতিটি অন্তরালে জাগে নব শিহরণ। মনকে নিয়ে যায় অনন্তের যাত্রা পথে। যেখানে গেলে চিত্ত লাভ করে অনাবিল প্রশান্তি।
বাংলা মায়ের অনিন্দ্য সুন্দর প্রাকৃতিক নিঃসর্গ ঐতিহ্যবাহী রাঙামাটি জেলার অপূর্ব সৌন্দর্য্যমন্ডিত একটি উপজেলা বিলাইছড়ি। কাপ্তাই লেকের কোলে শুয়ে আছে এই উপজেলা। বিলাইছড়ি উপজেলার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অপরূপ সৌন্দর্য্য। অনেকগুলো ছোট বড় পাহাড় আর ঝর্নায় সু-সমৃদ্ধ এই উপজেলা। যেদিকেই চোখ যায় সেইদিকেই যেনো অনন্ত সবুজের সমারোহ।
এই বিলাইছড়ি উপজেলার ১নং সদর ইউনিয়ন এর ৩নং ওয়ার্ডের দোজোড়ী পাড়ায় এই গাছকাটা ছড়া ঝর্ণা অবস্থিত। চাকমা ভাষায় দোজোড়ী হলো দুইটি ছড়ার সমাহার। এই দুটি ছড়ার মাঝখানে পাহাড়ের চূঁড়ায় এই ঝর্না অবস্থিত। বর্ষা কাল ছাড়াও বছরের প্রায় সময় এই ঝর্ণা হতে ঝিরিঝিরি শব্দ, মাভৈঃ ধ্বনি ও স্বচ্ছ জল প্রবাহ বয়ে যায়। যেই জলের প্রবাহমান ধারা মিশে গেছে কাপ্তাই লেকে।
তবে কি, এটি গাছকাবা ছড়া ঝর্না বা গাছকাটা ছড়া ঝর্না নামে এই ধরণীতে তাঁর আপন রূপ, সৌন্দর্য্য আর মাধুরিতে বেঁচে আছেন যুগ যুগ ধরে। না, এর নামকরণ নিয়ে শোনা যায় ভিন্ন কথা। স্থানীয় গাছকাবা ছড়া ভিসিএফ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুশীল বিকাশ চাকমা শোনালেন একটি ইতিহাসের কথা। সেই ইতিহাসের পাতায় পাতায় আছে বেদনা আর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দুঃখের গল্প। তিনি জানালেন, তাঁর দাদুর মুখ হতে শোনা ইতিহাসের করুণ কথা। শত বছর বা তার আগে এই ঝর্নার উপরে মাছ ধরতে যান দ্বন্ধ তঞ্চগ্যা এবং তারঁ স্ত্রী। যদিও তাঁর স্ত্রীর নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। মাছ ধরতে গিয়ে হঠাৎ পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় ঐ সময় তাঁরা পাহাড়ের চূঁড়া হতে পড়ে মারা যান। এই দ্বন্ধের নামকরণে স্থানীয়রা এই ঝর্নাকে ‘দ্বন্ধ পচ্চে তারেং ঝর্না’ নামে ডাকে। পরবর্তীতে এটি গাছকাবা ছড়া বা গাছকাটা ছড়া ঝর্না নামে পর্যটকদের কাছে সুপরিচিত লাভ করে।
এই ঝর্ণার সৌন্দর্য্য উপভোগ করার আগে দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, অনেকগুলো ছড়া, ছোট ছোট পাহাড় আর সবুজের ক্ষেত পেড়িয়ে পৌঁছাতে হয় এই ঝর্ণায়। পথেমধ্যে গাছকাটা ছড়া পাড়া, গোলকধন পাড়া আর দোজোড়ী পাড়া পার হয়ে মূল ঝর্ণার আগে দেখা মিলবে আরোও একটি ঝর্ণা। চাকমা ভাষায় যাকে ‘সাদার’ বা পাথরের ঝর্ণা বলে। ৩শ ফুট উপর হতে এর ঝর্ণান পানি প্রবাহিত হচ্ছে। হিম শীতল এই ঝর্নায় ভিজে যে কেউ তাঁর মনকে পবিত্রতায় ভরে তুলতে পারে।
কথা হয় এই দোজড়ী পাড়ার কার্বারি গোপাল চন্দ্র চাকমার সাথে। তিনি জানান, এই পাড়ায় ৪৮ পরিবারের বসবাস। তাদের মধ্যে চাকমা ২৬পরিবার, তঞ্চঙ্গ্যা ১৯ পরিবার এবং মারমা ৩পরিবার। জনসংখ্যা ২শত ২১ জন। অধিকাংশ পরিবার কৃষি এবং জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। তবে এই এলাকায় রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো উন্নয়ন করলে এইখানে পর্যটকের আগমন বাড়বে এবং এলাকার উন্নতি হবে।
একই কথা বললেন, সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি দেওয়ান আর ৩নং কুতুবদিয়া ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জয়তন তঞ্চঙ্গ্যা। তাঁরা এই এলাকার উন্নয়নে পর্যটন কর্পোরেশন এবং সরকারের নিকট আকুল আবেদন জানান। যাতে এই এলাকায় পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রেখে রাস্তাঘাট উন্নয়ন হয়।
ঝর্ণা দেখতে আসা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) জাবেদ আহমেদ বলেন, অসম্ভব সুন্দর একটি ঝর্ণা গাছকাটা ছড়া ঝর্ণা। আমরা এখনও এই ঝর্ণা পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে পারি নাই। তবে এই ঝর্ণাকে আমরা বিশ্বের কাছে পরিচিত করাতে চাই। যার ফলে এইখানে বিশ্বের অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় লোকজন আসবে। তিনি আরোও জানান, এই পথটা বন্ধুর, তাই আমরা এইখানকার রাস্তাঘাট, অবকাঠামো উন্নয়ন করতে চাই এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে এই ঝর্ণাগুলো আরোও সুপরিচিতি করাতে চাই, যাতে এই এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপ-পরিচালক সাইফুল হাসান জানান, আমরা পর্যটকদের জন্য নতুন নতুন গন্তব্য স্থান চিহ্নিত করার জন্য এই এলাকায় এসেছি। পর্যটকদের এইসব স্থানে আগমনের জন্য আমরা প্রমোশন এবং উদ্বুদ্ধকরণের কাজ করে থাকি। যার ফলে দেশ বিদেশের অনেক পর্যটক আসবে। কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমের মাধ্যমে আমরা এই এলাকার স্থানীয় জনগণের আয় বৃদ্ধি কিভাবে করা যায় সেই বিষয়ে কাজ করছি।
বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান জানান, এই উপজেলায় অবস্থিত গাছকাটা ছড়া ঝর্না এইখানকার অনিন্দ্য সুন্দর ঝর্ণার মধ্যে অন্যতম। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সবুজের সমারোহে এই ঝর্ণায় এসে যে কেউ মুগ্ধ হবেন। এইখানকার ঝর্ণা গুলোর উন্নয়ন করে আমরা এই এলাকার স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ঘটাবো।
বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান উৎপলা চাকমা জানান, এই উপজেলায় কাপ্তাই লেকের পাশাপাশি পাহাড়, ছড়া আর ঝর্ণা রয়েছে। তাই এইখানে পর্যটন উপযোগী পরিবেশ এবং উন্নয়ন করা যায় তাহলে এই এলাকার উন্নয়ন ঘটবে।
ঝর্ণা দেখতে আসা পর্যটকরা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, এই ঝর্ণা দেখতে সুন্দর, এই ঝর্ণা দেখতে এসে আমাদের অনেক আনন্দ লাগছে।
রাঙামাটি জেলা বা কাপ্তাই উপজেলা হতে নৌ পথে কাপ্তাই লেক ধরে ইঞ্জিন চালিত বোটে প্রায় ২ ঘন্টা সময় ধরে বিলাইছড়ি গাছকাটা ছড়া সেনাবাহিনী ক্যাম্পের ডান পাশ দিয়ে প্রথমে পৌঁছাতে হবে গাছকাটা ছড়া পাড়ায়। এরপর ঐস্থান হতে পায়ে হেঁটে ছোট ছোট পাহাড়, ছড়া, পাহাড়ি মেঠোপথ, সবুজের ক্ষেত পাড় হয়ে দোজোড়ী পাড়ায় যেতে হয়। এই পাড়ায় দুই ছড়ার মাঝখানে পাহাড়ের চূঁড়ায় এই ঝর্ণা অবস্থিত। তবে কাপ্তাই লেকের পাড় হতে ঝর্ণায় আসার প্রায় ৪ কিঃ মি পথই চলাচলের অনুপযোগী।
তবে অনেকেই আগের দিন এসে বিলাইছড়ি উপজেলায় এসে রাত্রি যাপন করে পরের দিন সকালে এই ঝর্ণা দেখতে যায়। বিলাইছড়ি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১৯ সালে পাহাড়ের টিলাতে নির্মাণ করা হয়েছে নীলাদ্রি রিসোর্ট। এই রিসোর্টে ৪টি সুন্দর কটেজ রয়েছে। কটেজ সংলগ্ন উপজেলা ক্যাফেতে উন্নত মানের খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
