ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের কারণেই বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে ভারতের সেভের সিস্টারখ্যাত সাত রাজ্যের নিবিঢ় যোগাযোগ। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই দশকের সশস্ত্র তৎপরতার ‘মূল কেন্দ্র’ হিসেবে বরাবরই আলোচনায় ছিলো মিজোরামের রাজধানী ‘আইজল’ এবং ত্রিপুরার ‘আগরতলা’। ভারতের এই দুটি শহর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর প্রথম-প্রধান এবং একমাত্র ঠিকানা ছিলো। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস,রাজনীতি আর ভাগ্যের সাথেও নিবিঢ়ভাবেই সম্পৃক্ত এই দুই শহর। শুধু তাই নয়, ষাটের দশকে প্রমত্তা কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কাপ্তাই বাঁধ দেয়ার ফলে উদ্বাস্তু হওয়া মানুষের একটি বড় অংশও ঠাঁই নেয় এই দুই রাজ্যের পাশাপাশি অরুনাচল প্রদেশেও। এছাড়াও পার্বত্য রাজনীতির নানা সংকটকালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বসত গেড়েছে এই তিন রাজ্যে।
অরন্য ইমতিয়াজ
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সাক্ষরের পর সন্তু লারমার নেতৃত্বে পাহাড়ের সশস্ত্র বিদ্রোহীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় এইসব রাজ্যে উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাস করা লক্ষাধিক মানুষ নিজ ঠিকানায় ফিরে আসেন। যদিও কেউ কেউ সেখানে রয়ে গেছেন। ফলে আত্মীয়তার ফেলে আসা বন্ধন ছাড়া পাহাড়ের রাজনীতিতে আর খুব একটা আলোচনা হচ্ছিলো না এই দুই প্রতিবেশী রাজ্যের নাম।
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে ফের আঞ্চলিক দলগুলোর ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত শুরু হলে আবারো আলোচনায় উঠে আসছে দুই শহর আইজল ও আগরতলা। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির শীর্ষ ও পরিচিত নেতাদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পেছনের গল্পেও ফিরে ফিরে আসছে এই দুই শহর। বলা হচ্ছে,এই দুই শহরেই অবস্থান নিয়েছেন তারা,পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই। এই বিষয়ে সম্প্রতি সীমান্ত সংলাপে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগও জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের আইনশৃংখলাবাহিনী ও সচেতন মহল থেকে বরাবরই দাবি করা হয়,পার্বত্য চট্টগ্রামের অরক্ষিত বিস্তির্ণ সীমান্ত দিয়ে অবাধে অস্ত্র ও অস্ত্রধারীদের যাতায়াতের কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছেনা। পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের বিপুল মজুদের জন্যও সীমান্তবর্তী এই রাজ্যগুলোর সাথে ‘অতিমাত্রায় যোগাযোগ’কে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। এনিয়ে বিব্রত ওই রাজ্য সরকারগুলোও। বিভিন্নসময় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি বাংলাদেশমুখি অস্ত্রের চালানও আটক করেছে তারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৩ সালের মার্চ মাসে মিজোরাম পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী বাংলাদেশে পাচার করার জন্য বিদেশ থেকে আনা এক বিরাট অস্ত্রের চালান তারা উদ্ধার করেছে বলে জানায়। সেসময় এই অস্ত্র পাচারের সঙ্গে জড়িত তিনজনকে আটকও করা হয়েছে। মিজোরামের পুলিশ ও আসাম রাইফেলসের কর্মকর্তারা জানান, এই সব অস্ত্র বার্মা থেকে এনে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছিল বলেই তারা ধারণা করছেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আইজল শহরের কাছে যে বিমানবন্দর রয়েছে, তার কাছে দুটি স্থান থেকে পরপর দুদিন অর্থাৎ ৭ এবং ৮ই মার্চ তল্লাশি চালিয়ে এসব অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে বলে জানিয়েছিলো।
পুলিশ আরো জানিয়েছিলো এইসব অস্ত্রশস্ত্র মিয়ানমার থেকে এনে মিজোরামের মধ্যে দিয়ে আপাতত ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় ত্রিপুরা রাজ্যে পাঠানো হচ্ছিল। সেখান থেকে এইসব অস্ত্রশস্ত্রের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ বলে মিজোরাম পুলিশ ধৃত তিনজনকে জেরা করে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছিলো,বলে নিশ্চিত করেছিলো।
২০১৪ সালের মার্চে মিজোরামের রাজধানী আইজলের কাছের একটি গেস্ট হাউজ থেকে ৩১টি রাইফেল, একটি হালকা বন্দুক ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করে আসাম রাইফেলস।
২০১৪ সালের আগস্ট মাসে দেশটির আরেক সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ চোরাকারবারীদের কাছ থেকে আটটি একে সিরিজের রাইফেল উদ্ধার করে। ওই সময় স্থানীয় তিন চাকমার সঙ্গে দুই বাংলাদেশি চাকমাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। মিয়ানমার থেকে মিজোরাম হয়ে এসব অস্ত্রের চালান বাংলাদেশে পার্বত্য এলাকায় সশস্ত্র গ্রুপগুলোর কাছে যায় বলে জানিয়েছিলো সংশ্লিষ্টরা।

২০১৫ সালের ২৪ অক্টোবর মিজোরাম রাজ্যের দুটি গ্রাম থেকে ১২টি ম্যাগাজিনসহ পাঁচটি একে-৪৭ ও তিনটি একে-৫৬ রাইফেল উদ্ধার করেছে সেদেশের সীমান্তরক্ষী আধাসামরিক বাহিনী আসাম রাইফেলস। মিজোরাম পুলিশ এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছিলো। রাজ্যের সেরচিপ জেলার কেতুম ও খলেলুঙ গ্রামে আসাম রাইফেলসের সদস্যরা শুক্রবার ভোরে এক অভিযান চালিয়ে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। এ সময় মিনচুঙ্গা (৫৫) ও ভেনপুইলালা (৩০) নামে দুই মিজো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ওই দুটি গ্রাম মিজোরামের রাজধানী আইজল থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। উদ্ধার অস্ত্রের মধ্যে পাঁচটি একে-৪৭, তিনটি একে-৫৬ রাইফেলের পাশাপাশি একে সিরিজ রাইফেলের ১২টি ম্যাগাজিন পাওয়া যায়।
২০১৮ সালের ১৭ আগষ্ট পৃথক আরেকটি অভিযানে মিজোরামের চাম্পাই জেলায় পৃথক আরেকটি অভিযানে আটটি ভারি অস্ত্র আটক করে আসাম রাইফেলস,যার দুটি মার্কিন ও দুটি জার্মানীতে তৈরি বলে জানিয়েছিলো তারা।
২০২০ সালের ৮ ডিসেম্বর মিজোরামের দুইটি চেকপোস্ট থেকে ৫টি ম্যাগাজিন, একটি বন্দুকসহ ২৮টি একে-৪৭ ও একটি করে একে-৫৬ ও একে ৭৪ রাইফেল, ৪ হাজার ৪৯১ রাউন্ড গুলি, নগদ ৩৯ হাজার রুপি ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীটি।

এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর মিজোরামে পাচার হয়ে আসা অস্ত্র বোঝাই দুটি গাড়ি আটক করে বিএসএফ। ৩ জনকে আটক করে মামিট জেলার ফাইলেঙ থানার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অস্ত্র বোঝাই গাড়ি দুটি সিরিজের রাইফেলসহ এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, ম্যাগাজিন, গুলি বহন করছিলো।
এক বিবৃতিতে বিএসএফ জানিয়েছিলো পশ্চিম ফাইলেঙের দিক থেকে আসা দুটি পিকআপ ভ্যান আটক করা হয়। সেগুলিতে থাকা আইজলের বাসিন্দা লালহুয়াপজাউপা, লিয়ানসাঙ্গা, ভানলালরুয়াতাকে আটক করা হয়। গাড়ি দুটিতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে দুটি গোপন গর্ত পায়। সেখান থেকে ২৮টি ৭.৬২ এমএম একে সিরিজের রাইফেল, একটি ৫.৫৬ এমএম–এর একে–৭৪, একটি কার্বাইন, ২৮টি ম্যাগাজিন এবং ৭ হাজার ৮৯৪টি গুলি, ৩৯ হাজার টাকা উদ্ধার হয়।’ বিএসএফ সেসময় জানায়,ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সুরক্ষায় তারা তৎপর।’
সর্বশেষ গত জানুয়ারি মাসের ২২ তারিখ মিজোরামে আসাম রাইফেলসের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বহু আগ্নেয়াস্ত্র। পাচারকারী অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। বিশেষ সূত্রে প্রাপ্ত গোপন তথ্যের ভিত্তিতে রাজ্যের চাম্পাই জেলার জুট এলাকার প্রত্যন্ত ঘন জঙ্গলের এক স্থানে অভিযান চালায় আসাম রাইফেলস। এই অভিযানে তিনটি একে ৫৬ রাইফেল, তিনটি খালি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়।

ওদিকে ভারতে অস্ত্র উদ্ধার ও আটকের পাশাপাশি বাংলাদেশেও প্রায়শই সন্ত্রাসী আস্তানায় হানা দিয়ে অস্ত্র আটক করছে আইনশৃংখলাবাহিনী। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি অভিযানে ছোট বড় বেশ কিছু অস্ত্র আটক করা হয়। আইনশৃংখলাবাহিনীর একটি সূত্র জানাচ্ছে-২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় বছরে পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে প্রায় ৭০০টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব অস্ত্রের মধ্যে সেভেন পয়েন্ট ৬২ এমএম দু’টি এসএমজি,অ্যাসল্ট রাইফেল,পিস্তল,বন্দুক এবং একে-৪৭’র মতো অস্ত্রই বেশি।
সূত্রগুলো জানাচ্ছে- পাহাড়ের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো এলএমজি, এসএমজি, একে-৪৭, সেভেন পয়েন্ট ৬২ মি.মি.রাইফেল,এম-১৬ রাইফেল, জি-৩ রাইফেল, জিরো পয়েন্ট ২২ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, দেশি-বিদেশি পিস্তল, মর্টার, দেশি-বিদেশি বন্দুক, হ্যান্ড গ্রেনেড এবং রকেট লাঞ্চার ব্যবহার করে থাকে।
আইনশৃংখলাবাহিনীর সূত্রগুলো বলছে-রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার ছোট হরিণা, বড় হরিণা, বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক, জুরাছড়ির আন্ধারমানিক, ফকিরাছড়ি, বিলাইছড়ি, খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার নারাইছড়ি, পানছড়ির দুদুকছড়ি, কেদারাছড়া, মাটিরাঙ্গা উপজেলার আচালং, রামগড় উপজেলার বাগান বাজার, বড়বিল, রামগড় বাজার, বান্দরবানের থানচি ও নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তবর্তী এলাকার রুটকে অস্ত্র চোরাচালানের জন্য ব্যবহার করছে অপরাধীরা।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, ‘ওরা’ এখন ‘সেকেন্ড ফেজ ইনসারজেন্সি’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা করছে। সীমান্তের ওপারে গড়ে তুলেছে ১৪টি ক্যাম্প। গত এক বছরে মূল জেএসএস এবং ইউপিডিএফের সশস্ত্র রাজনৈতিক শাখার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ৮০ জন তাঁদের পরিবারের সদস্যদের পাশের একটি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এই পাহাড়ি সশস্ত্র গ্রুপগুলোর কাছ থেকে সম্প্রতি যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে তাতে তাদের ভারী অস্ত্র সংগ্রহের প্রমাণ মিলছে। গত বছর ২৮ নভেম্বর সকালে বাঘাইহাটে একটি আঞ্চলিক দলের গোপন আস্তানা থেকে সেনাবাহিনী দুটি একে-৪৭ ও একটি এসএমসি উদ্ধার করে। এর আগে এলএমজি, ৭.৬২ মিলিমিটার রাইফেল, এম-১৭ রাইফেল, জি-৩ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, মর্টার, হ্যান্ড গ্রেনেড ও রকেট লঞ্চার উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

আইনশৃংখলাবাহিনীর পক্ষ থেকে এসব রুটে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সীমান্তসড়ক নির্মিত হলে এই অস্ত্রের রুটগুলো বন্ধ করা সম্ভব হবে বলেও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তার আগে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে ‘অপরাধীদের প্রশ্রয় না দেয়া’র নীতিতে সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাহাড়ে সক্রিয় চারটি আঞ্চলিক দলেরই সশস্ত্র ইউনিট থাকলেও এনিয়ে কখনই মুখ খোলেনা তারা,স্বীকারও করেনা। তবে বিষয়টি এতই ওপেন সিক্রেট যে,তাদের স্বীকার করা না করায় আদতে কিছু যায় আসেও না। অসমর্থিত একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির প্রায় সাড়ে তিনশ সদস্যের একটি সশস্ত্র শাখা আছে,যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন লক্ষী প্রসাদ চাকমা ও সুভাষবসু চাকমা। এই দুই নেতাই বেশ কিছু দিন ধরে মিজোরামে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি দলটির শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই মিজোরাম,আসাম,আগরতলা,কলকাতায় অবস্থান করছেন বলে দাবি করেছে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র।
অন্যদিকে আরেক গুরুত্বপূর্ণ দল প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র কর্মীর সংখ্যা ২৫০ জনের মতো,যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমানে কারাগারে আটক রঞ্জনমনি চাকমা আদিবাবু, কিন্তু তিনি জেলে থাকায় এই কাজটি তদারকি করছে সচিব চাকমা । পাশাপাশি তাদের দুই প্রভাবশালী নেতা উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা ও প্রদীপন খীসা ভারতের আগরতলায় অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। অন্যদিকে জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র সশস্ত্র শাখায় প্রায় শ’খানেক সদস্য আছে,যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রজ্ঞান জ্যোতি চাকমা। আর সর্বশেষ আত্মপ্রকাশ করা ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) এর সশস্ত্র কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫০/৬০ জন,যাদের নেতৃত্ব দেন খোদ দলের প্রধান শ্যামল কান্তি চাকমা জলোয়া ওরফে তরু।
জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)’র তথ্য ও প্রচার বিভাগের জুপিটার চাকমা বলেন, ‘যাদের অবৈধ টাকা আছে তারাই অস্ত্র কারবারিদের কাছ থেকে অস্ত্র কিনছে। তবে কিভাবে অস্ত্র ঢুকছে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু জানি না।’
ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা জলোয়া বলছেন, ‘বাংলাদেশের সীমান্তের পূর্বাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত বিশাল এলাকা অতি দুর্গম হওয়ায় সেখানে ঠিকভাবে নজরদারি করা যায় না। ফলে টাকা থাকলে অস্ত্র আনা যায়। প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ ও সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি চাঁদা তুলে সেই টাকায় অস্ত্র কিনে আনছে। সেই অস্ত্র দিয়ে খুনাখুনি চালাচ্ছে।’
প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা বলেন, ‘কোথা থেকে অস্ত্র আসছে, তা বলা মুশকিল। পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই পাহাড়ে হানাহানি চলছে।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি আলকাছ আল মামুন ভূইয়া জানিয়েছেন, ‘যেখানে ভারত ও মায়ানমারের ১৭৮ কিলোমিটার সীমানায় আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রন বা নজরদারি নেই; সেখানে তো নির্বিঘ্নেই অস্ত্র আসতে পারে। পার্বত্য এলাকা থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে সেই টাকায় তারা অস্ত্র কিনছে।মূলত: চাঁদার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্ধের কারণে নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। সংঘর্ষে গুলিতে পাখির মত প্রাণ হারাচ্ছেন তাদের লোকজন। এর শিকার হচ্ছেন সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙ্গালীরাও। সীমান্ত এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন ও রাস্তাঘাটের বিস্তৃতি ঘটাতে পারলে অবৈধ অস্ত্র আসা অনেকাংশে কমে যেতো। তিনি অবিলম্বে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্বারে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার দাবী জানান।
আঞ্চলিক দলগুলোর নেতারা যাই বলুন না কেনো,পাহাড়ে ফের ধীরে ধীরে অস্বস্তি বাড়ছে,এটা সত্যই। আর এই অস্বস্তির মূল যে,সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আসা বিপুল অবৈধ অস্ত্র,তা বলাই বাহুল্য। তবে কি পাহাড় ফিরছে ফের পুরনো ভয় আর আতংকের দিনে ? নাকি সবই আঞ্চলিক ‘ভূ-রাজনীতি’র পরিকল্পিত ‘আন্তর্জাতিক খেলা’,কে জানে ! তবে পাহাড়ের সব শ্রেণী পেশার মানুষই চান,স্বস্তি আর শান্তির জীবন। জাতিগত বিবাদ আর বিরোধ ভুলে পৃথিবীর সব মানুষের সাথে সমানতালে পা ফেলে সমান অধিকার নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষও,চায় নিরাপদ জীবন।
