অপু দত্ত
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় শিক্ষা প্রচলনের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত বই প্রকাশ করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এসব ভাষায় শিক্ষা প্রদান করা। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারনে এইসব ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম আরো বেশী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় খাগড়াছড়ির কিছু উদ্যোমী তরুন শিক্ষা কর্মকর্তা, শিক্ষক ও এনজিও কর্মী উদ্যোগ নেয় অনলাইনের মাধ্যমে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার। সেই উদ্যোগের ফসল হিসেবে ‘এমএলই অন লাইন স্কুল’।(এমএলই- মাল্টি ল্যাংগুয়েল এডুকেশন) শতাধিক ক্লাস ইতিমধ্যে প্রচার করেছে।
খাগড়াছড়ি জেলা সদরের উপজেলা রিসোর্স সেন্টার এর কার্যালয়। দুই কক্ষের এই ভবনের একটি কক্ষে চলে প্রশিক্ষণ অন্য কক্ষে কার্যালয়। করোনা মহামারির কারনে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বন্ধ রয়েছে। এই বন্ধের সময়ে প্রশিক্ষণ কক্ষে এখন ‘এমএলই অনলাইন স্কুল’ এর রেকডিং এর কার্যক্রম চলছে। রেকডিং করা এই ক্লাশগুলো অনলাইনে প্রচার করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় ১১৮টি ক্লাশ প্রচার করা হয়েছে। প্রাক প্রাথমিক শ্রেণীর পাঠ্যসূচি অনুযায়ী তা করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ির ঠাকুরছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনক ত্রিপুরা ও খাগড়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক বাবলী ত্রিপুরা বলেন, অনলাইনে ক্লাস নেয়া সহজ কাজ নয়। তারপর নিজের ভাষার জন্য কাজ করতে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। পরিবারের সাথে যে ভাষায় কথা বলি গেন ভাষায় বাচ্ছাদের পড়াচ্ছি।
এমএলই অনলাইন স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব প্রশিক্ষক রিন্টু বিকাশ চাকমা বলেন, করোনাকালীন শিশুদের মূল বইগুলো নিয়ে অনলাইনে পড়ানো হলেও আমাদের মাতৃভাষার বইগুলো পড়ানো হচ্ছেনা। তাই আমরা ভাবলাম শিশুদের হাতে যেহেতু সরকার মাতৃভাষার বই তুলে দিয়েছে তাহলে আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিলে ঘরে বসে পড়তে পারবে। সেই চিন্তা থেকে এমন উদ্যোগ।
এই কার্যাক্রমের সাথে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার ২৭ জন শিক্ষক শিক্ষিকা সহ ৩৫ জন সংশ্লিষ্টরা রয়েছেন। সকলেই সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে, কোন সম্মানী ছাড়াই এই ক্লাশ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছে। শিশুদের অনলাইন ক্লাশের প্রতি আকৃষ্ট করতে ক্লাশ নেয়ার সময় ‘পাপেট’ ব্যবহার করা হয়েছে। তিন ভাষার জন্য চারটি পাপেট এর চরিত্র রাখা হয়েছে। প্রতিটি ক্লাশ ১০-১৫ মিনিট দীর্ঘ হয়। এ পর্যন্ত প্রচারিত ক্লাশের সর্ব্বোচ্চ ভিউয়ার সংখ্যা ১১ হাজার। আর অন্যান্য ক্লাশ গুলোতে ৩-৪ হাজার ভিউয়ার হয়।
এমএলই অনলাইন স্কুল পরিচালনা কমিটির সহ সভাপতি মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, করোনাকালীন স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাসায় ঘরবন্দি হয়ে যায়। তাই যে সকল শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষা পাওয়ার কথা তাদের জন্য আমরা অনলাইনে ক্লাস চালু করেছি। এটি মূলত খাগড়াছড়িতে শুরু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে রাঙ্গামাটি, বান্দরবানসহ দেশের যেখানে ক্ষুদৃ নৃগোষ্টী শিশুরা আছে সেখানে ছড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছে আছে।
স্থানীয়ভাবে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে অনলাইনে ক্লাশ নিতে শুরু করেছে। এই সব উদ্যোগ দেখে পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার তিনটি ভাষার ক্লাশ অনলাইনে প্রচার করা হয়েছে। উদ্যোক্তারা জানান, প্রচারিত ক্লাশগুলো দেখে এখন অন্যরাও নিজেদের ভাষায় ক্লাশ নিতে পারবে। এক সময় বাংলাদেশের সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের ভাষার শিক্ষা তারা প্রচারের উদ্যোগ নিতে পারবে। তবে এর জন্য সরকারের সহযোগিতা দরকার।
