পার্বত্য শহর রাঙামাটির আবাসিক এলাকা হিসেবেই পরিচিত তবলছড়ি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের আবাসিক কোয়ার্টার আর পুরনো রাঙামাটি শহরের নদীবর্তী এই জনপদটি নানা কারণেই শহরের সবচে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’খ্যাত ঝুলন্ত সেতু বা পর্যটন কমপ্লেক্স,শহরের সবচে পুরনো সাধারন পাঠাগার যেমন এই এলাকায় অবস্থিত,তেমনি সরকারি বেশ হয়েকটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কার্যালয়ও এই ওয়ার্ডে। তবলছড়ি বাজারের ব্যস্ততা আর পর্যটন এলাকার নির্জনতা নিয়েই এই ওয়ার্ড। তিনটি ভোটকেন্দ্র রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,দক্ষিন বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেই নিজেদের পছন্দের প্রার্থী বেছেন নিবেন ভোটাররা।
এবার এই ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে চান বেশ কয়েকজন প্রার্থী,যাদের প্রায় সবাই নবীন। এই পর্যন্ত যাদের নাম শোনা যাচ্ছে,তারা হলেন বর্তমান কাউন্সিলর মিজানুর রহমান বাবু,সাবেক কাউন্সিলর শহীদ চৌধুরী, যুবদল নেতা নুরনবী,ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল আলম রাশেদ, মোহাম্মদ আলমগীর এবং আব্দুস সালাম।
এই ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মিজানুর রহমান বাবু রাঙামাটি পৌরসভায় ইতিপূর্বেও কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়ার্ডবাসির ‘বিপদের বন্ধু’ হিসেবেই পরিচিত বাবু,সাধারন মানুষের কাছে খুব গ্রহণযোগ্য ও পরীক্ষিত কাউন্সিলর। এলাকার যেকোন মানুষের বিপদে আপদে সবার আগে ছুটে যান তিনি,কারো মৃত্যু হলে জানাজা থেকে শুরু করে দাফন পর্যন্ত সার্বক্ষণিক সেবা দেয়া বাবুর প্রতি সাধারন মানুষের তাই রয়েছে ব্যাপক সমর্থনও। করোনাকালে মানুষের পাশে থেকেও বাড়িয়েছেন নিজের জনপ্রিয়তা। ওয়ার্ডের ‘বিশিষ্ট ব্যক্তি’দের সমর্থন কম থাকলেও সাধারন মানুষের কাছে তার প্রশ্নাতীত জনপ্রিয়তা,এবারো তাকে ভোটের মাঠে বেশ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবেই রাখবে। সেই সাথে সাম্প্রতিক সময়ে এই ওয়ার্ডে পৌরসভার বেশ কিছু কাজ শুরু হওয়া এবং সেই কাজ আনায় তার প্রয়াসও তাকে এগিয়ে রাখবে। তবে নির্বাচন বরাবরই ‘লটারী’র মতো ‘ঝুঁকি’রও। প্রতি ভোটের সন্ধ্যার আকাশ, সবসময় একই রঙ ধারণ করে নাহ! ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। সেইসব বদলানোর উপরই নির্ভর করছে মিজানুর রহমান বাবুর জয় পরাজয়।
বিএনপি নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর শহীদ চৌধুরী এবার প্রার্থী হচ্ছেন। ‘অসাধারন বাগ্নিতা’র জন্য সুপরিচিত শহীদ তবলছড়ি এলাকায় বেশ পরিচিত নাম। মসজিদ কলোনী কেন্দ্রীক তার ‘রিজার্ভভোট’ এবং পুরনো পরিচয় ও দলীয় সমর্থন যদি তিনি ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারেন,তবে বিজয়ী হওয়ার দৌড়ে থাকবেন তিনিও। তবে নতুন ভোটারদের সাথে পুরনো এই প্রার্থী নিজের পরিচিতির সংযোগ তিনি কতটুকু পুনস্থাপন করতে পারেন,তার উপরই নির্ভর করছে তার জয় পরাজয়। তবে সেই চেষ্টা যে তিনি করবেন,সেটা নিশ্চিত। কারণ ‘পুরান চাল সবসময়ই ভাতে বাড়ে’ !
নুরনবী জেলা যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি। গতবার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোট পেয়ে চমকে দিয়েছিলেন সবাইকে। সেইবার জিততে না পারলেও এইবার জিততে চান তিনি। জেতার জন্য শুরু করেছেন ব্যক্তিগত জনসংযোগ,চেষ্টা করছেন মরিয়া হয়েই। তবে ভোটের মাঠে যদি নিজ এলাকার তরুণ ভোটারদের কাজে লাগাতে না পারেন এবং নিজের দলের কর্মীদের ঠিকঠাক সহায়তা না পান,তবে সেই চেষ্টা কঠিনই হবে তার জন্য। দলীয় সাংগঠনিক পরিচয় আর এডিসি হিল এলাকার একক প্রার্থী হিসেবে হয়তো বাড়তি কিছু ভোটও যোগ হতে পারে তার ব্যালটবাক্সে,সেটা জয়ের জন্য যথেষ্ট কিনা বলা মুশকিল। তবে এইসব নানান সমীকরণে ভোটের মাঠে তার বিজয়ী হওয়াও বিচিত্র নয়।
জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাইফুল আলম রাশেদও এই ওয়ার্ড থেকে প্রার্থী হতে চান এবার। এই ওয়ার্ডে থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করা রাশেদ,নিজের বন্ধুবান্ধব,রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং আত্মীয়স্বজনের ভোটকে কাজে লাগাতে চান। নিজের সাবেক ক্রিকেটার ভাবমূর্তি,জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য আর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়তা ও পরিচয়কে ইতিবাচক ব্যবহার করে জিততে প্রানান্ত চেষ্টা চালাবেন ওমদামিয়া পাহাড়-পর্যটন এলাকার একমাত্র প্রার্থী, এই তরুণ। তবে জিততে হলে নিজ দলের ‘দলীয় সমর্থন’ আর এলাকার ‘মুরুব্বী’দের সহযোগিতাও লাগবে তার,লাগবে এলাকার তরুণদের ঐক্যবদ্ধ সমর্থনও। তবেই হয়ত ভোটের দিন গণণা শেষে হাসিমুখে ঘরে ফিরতে পারেন এই তরুণ।
তবলছড়িবাসির খুব চেনামুখ মোহাম্মদ আলমগীর। সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী আলমগীর এখন আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়। তবলছড়ি বাজারবাসির সুখে দুখের সাথি এই তরুণ,নিজের বাবার পরিচিতি আর বাজারের আবাসিক এলাকায় বেড়ে উঠায় পাবেন বাজারের ব্যবসায়িদের বাড়তি সমর্থন ও সহযোগিতা। আর যদি দলীয় সমর্থন যোগাড় করতে পারেন,সেটা হবে তার জন্য বাড়তি পাওনা। তার জয় পরাজয় নির্ভর করছে,নিজেদের ক্লাবের সদস্য,বাজারের দোকানদার আর নিজের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের আন্তরিক প্রয়াসের উপরই। কদিন আগেই নিজের ছবি সম্বলিত পোস্টার সাঁটিয়ে দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন এলাকাবাসির। দীর্ঘদিন তবলছড়ি বাজার এলাকা থেকে কেউ কাউন্সিলর না হওয়ার যন্ত্রনায় পোড়া,বাজারবাসি যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার প্রতীকে সিল মারে,তবে আলমগীরও হতে পারেন এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর।
এই ওয়ার্ডের মিয়াজী পাহাড় এলাকার বাসিন্দা আব্দুল সালাম। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা এই তরুণ এবার কাউন্সিলর প্রার্থী হতে চান। ইতোমধ্যেই ব্যানার টানিয়ে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন মানুষকে। ধনমিয়া পাহাড় এলাকার একমাত্র প্রার্থী হতে যাচ্ছেন সম্ভবত তিনি। যদি এলাকার তরুণ-প্রবীনরা তার পক্ষে একযোগে কাজ করেন এবং তার নিজ এলাকার মানুষ সবভুলে নিজেদের এলাকা থেকে কাউন্সিলর বানাতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেন,তবে এই তরুণও ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন।
ভোটের মাঠে কে বিজয়ী হবেন,সেই আলোচনার চেয়েও এখন জরুরী হয়ে উঠেছে,এই ওয়ার্ডে কে পাচ্ছেন,প্রধান দুই দলের প্রকাশ্য বা গোপন সমর্থন। যে সমর্থনের উপর ভর করে ‘নির্বাচন যুদ্ধ’ পাড় হতে চাইবেন বেশ ক’জন প্রার্থীই। তবে এদের মধ্যেও কেউ কেউ আছেন,যারা দল নয়,মত নয়,পথ নয়, মানুষের ভালোবাসার ভোটেই হয়ত ঘরে ফিরবেন জয়ের মালা গলায় নিয়ে,ভোট গণনা শেষে,সারাদিনমানের কষ্ট আর পরিশ্রম ভুলে,জয়ের হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে।
