বর্ষা মৌসুম যেন পার্বত্য জেলা রাঙামাটির মানুষের কাছে এক আতঙ্কের সময়। প্রতিবছরই এই সময়টা এলেই পাহাড়ধস আতঙ্কে থাকেন জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত মানুষ। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে রাঙামাটিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। তবে ঝুঁকিতে বসবাসরতরা বলছেন, তারা নিরূপায় হয়েই ‘মৃত্যুকূপে’ বসতি গড়ে তুলেছেন।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, কেবলমাত্র রাঙামাটি শহরের ২৫টি স্থানে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে পাঁচ হাজারের অধিক পরিবার। এই ৫ হাজার পরিবারের জনসংখ্যা কমপক্ষে চারজন করে হলেই মোট ২০ হাজার মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আছে শহর এলাকাতেই। সম্প্রতি রাঙামাটি জেলা শহরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রূপনগর, শিমুলতলী, ভেদভেদী নতুন পাড়া, মনতলা, যুব উন্নয়ন এলাকায় সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। পাহাড়ে পাদদেশে বসবাসরতদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া জেলা শহরে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২৩টি আশ্রয়কেন্দ্র।
ভেদভেদী যুব উন্নয়ন এলাকার রিপন চাকমা জানিয়েছেন, ঝুঁকি জেনেও আমাদের নিজের ঘরেই থাকতে হচ্ছে। ২০১৭ সালের পর থেকে প্রতিবছর বর্ষার দিনে বৃষ্টি পড়লেই আতঙ্কে থাকি। কিন্তু আমাদের এই বসতভিটা ছাড়া বিকল্প বাসস্থান না থাকায় তাই বাধ্য হয়ে এখানেই থাকতে হচ্ছে। তাই এখন বৃষ্টির দিনে ভয় বুক বেঁধে থাকতে হচ্ছে।
রূপনগর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এলাকার মানুষ এখন বর্ষা মৌসুম এলে ভয়ে-আতঙ্কে থাকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিবছরই আমাদের সাবধান থাকতে বলা হচ্ছে। কিন্তু নিরুপায় হয়ে আমরা এই মৃত্যুকূপে পড়ে আছি। অন্যত্র সরে যাওয়ার মত অবস্থা থাকলে কেউই ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করতেন না।
রাঙামাটি পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রবি মোহন চাকমা বলেন, ২০১৭ সালের রাঙামাটিতে ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটে। তখন সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও জানমালের ক্ষতি হয়েছে আমার এলাকাতেই। তবে বিগত ২০১৮-১৯ সালে এলাকার মানুষ সচেতন থাকায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এবছরই আমরা আগাম প্রস্তুতি নিয়েছি। জেলা প্রশাসনও পাহাড়ধস ঠেকাতে করণীয় নির্ধারিত কাজ করে যাচ্ছে। যাতে করে আমাদের নতুন করে আবার কোনো প্রাণহানি দেখতে না হয়। এবছর জেলা প্রশাসন ও পৌরসভাকে করোনার কারণে দুইদিক দেখতে হচ্ছে। তারপরও আমাদের কাউন্সিলরগণ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে জনসাধারণকে সচেতন করছেন। সর্বোপরি পাহাড়ধসে মৃত্যু ঠেকাতে আমরা সকলেই একযোগে কাজ করে যাচ্ছি।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে যে সকল কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তারই অংশ হিসেবে জেলা শহরের পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আমরা সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। এছাড়া জনসাধারণকে সচেতন করতে ও আশ্রয়কেন্দ্রের নামসহ প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছে। যাতে করে তারা বিপদে পড়লে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেন। করোনার এই মহামারীতে সময়ে রাঙামাটিতে জেলা প্রশাসনকে পাহাড়ধস ও করোনার ঝুঁকি- দুই দিকই সামলাতে হচ্ছে। তারপরও আর বিগত বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই আগামী প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছি। আমরা আশাবাদী, জনসাধারণ সচেতন থাকলে এবছর রাঙামাটিতে কাউকে পাহাড়ধসে প্রাণ দিতে হবে না।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় ১২০ জনের প্রাণহাতি ঘটে। এসময় জেলাজুড়ে তাÐবে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এছাড়া জেলা শহরের সঙ্গে চট্টগ্রামের প্রধান সড়ক ও খাগড়াছড়ি সড়কের একটি বিশাল অংশ ধসে টানা ১৭ দিন সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে পার্বত্য রাঙামাটি। এর পরের বছর ২০১৮ সালের ১২ জুন জেলার নানিয়ারচরে পাহাড়ধসের ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালেও জেলার কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধসে তিনজনের মৃত্যু হয়। স্মরণকালের বিভীষিকাময় অতীত থেকেই প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুম এলেই রাঙামাটির মানুষের আতঙ্ক বিরাজ করে।
