করোনার বিরুদ্ধে দৃশ্যত যুদ্ধই করছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ। রাতদিন নাওয়া খাওয়া ভুলে দৌড়াচ্ছেন,এখন থেকে ওখানে,নিচ্ছেন নানা ধরণের সিদ্ধান্ত। স্বাভাবিকই তো তার এইসব কাজ। কারণে জেলা পর্যায়ে সরাসরি সরকারের প্রতিনিধি জেলাপ্রশাসকই। আর একজন দক্ষ ও যোগ্য জেলা প্রশাসক জেলার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জেলার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় সবচেয়ে মূখ্য ভুমিকা পালন করতে হয় জেলাপ্রশাসককে। এছাড়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সেবা জনগণের দৌঁড়গোড়ায় পৌঁছে দিতেও অগ্রনী ভুমিকা রাখেন জেলাপ্রশাসক। আর জেলা প্রশাসকের থাকে এক ঝাঁক মেধাবী ও উদ্যোমী তরুন অফিসার। জেলাপ্রশাসক যতই বিচক্ষণ হবেন তাঁর অধিনস্থরাও তত দক্ষতার সাথেই দায়িত্ব পালন করবেন-এটাই স্বাভাবিক। রাঙামাটি জেলাপ্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ অত্যন্ত চৌকষ একজন ও দক্ষ একজন প্রশাসক। ফলে তাঁর নেতৃত্বাধীন অফিসারগণও অত্যন্ত দক্ষতার সাথেই দায়িত্ব পালন করেন।
মহামারী করোনা সংক্রমনের ঝুঁকি থেকে রাঙামাটিবাসীকে সুরক্ষা এবং সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাতদিন পরিশ্রম করছেন জেলাপ্রশাসক ও তাঁর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ। একদিকে লোকজনদের ঘরে ঘরে সহায়তা পৌঁছানোর মত কঠিন কাজ আন্তরিকতার সাথে করে চলেছেন। জেলাপ্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ যেমন অসহায় লোকজনের কাছে নিজেই খাদ্য সহায়তার ব্যাগ বয়ে নিচ্ছেন। তেমনি বসে নেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণও। কি রাত কি দিন-সব যেন তাঁদের কাছে একই সমান।
রাতদিন ছুঁটে চলা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেগণ হলেন, পল্লব হোম দাশ, মোঃ মশিউর রহমান, সাকিনা আকতার, মোঃ ইসলাম উদ্দিন, আরিফুল ইসলাম, শানজীদা মুস্তারী, লাইলাতুল হোসেন, মোঃ বোরহান উদ্দিন মিঠু ও অঞ্জন কুমার দাস।
কাজ করতে গিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তাঁরা। প্রত্যেকের অভিন্ন কথা-‘ডিসি স্যার আমাদেরকে যেভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন সেভাবেই কাজ করছি। স্যার অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দুরদর্শিতার সাথেই পরিস্থিতি মোকাবেলার দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। স্যারের কাজ দেখে আমরাও উৎসাহিত হচ্ছি অনুপ্রেরণা পাচ্ছি। ফলে কাজে এতটুক অস্বস্থিবোধও করছিনা।’
পল্লব হোম দাশ বলেন, ‘আমরা যতটুকু প্রচেষ্টা চালাচ্ছি সেই হিসেবে লোকজন এখনো সচেতন নয়। ডিসি স্যারের নেতৃত্বে এবং নির্দেশে আমরা সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছি। তারপরেও লোকজন বিভিন্ন অজুহাতে ঘর থেকে বের হচ্ছে। পরে অবশ্য তারাই স্বীকার করছে যে তারা মিথ্যা বলে বের হচ্ছে। তাদের বুঝানোর চেষ্টা করছি। যেহেতু গত এক মাসে করোনা রোগী পাওয়া যায়নি। এটা অবশ্যই জেলাবাসীর জন্য পজেটিভ খবর। আগামী দিনগুলোতেও মানুষ সচেতন হলে রাঙামাটিতে সুরক্ষা রাখা যাবে বলে বিশ্বাস কর্।ি এজন্য জনগণের সচেতনতাও জরুরী।’
মোঃ মশিউর রহমান বলেন, আমরা শুরু থেকেই লোকজনদের বুঝানোর চেষ্টা করছি। বারবার বুঝানোর পরেও লোকজন একই ভুল করছে; তারপরেও আমরা কঠোর হচ্ছিনা। বাজারগুলো নিয়ন্ত্রনে রাখতেও যথেষ্ট চেষ্টা চালাচ্ছি। বিশেষ করে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ঘরে রাখলেই হয়। অভিভাবকদেরও সবসময় বুঝাচ্ছি এই রোগ যে কত মারাত্মক এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা কেন জরুরী। তবে অন্যান্য জেলার চেয়ে রাঙামাটিতে আমরা সফল বলব। যখন লোকজন কথা শুনে এবং আমরা কোন কাজে সফল হই, তখনতো ভালই লাগে। ডিসি স্যার অত্যন্ত আন্তরিক এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী আমরাও আন্তরিকতার সাথেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
সাকিনা আকতার বলেন, ‘সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য লোকজনদের বুঝাচ্ছি। আমাদের দেখলে লোকজন সরে যায় কিন্তু আমরা চলে আসলে আবারো বাইরে বের হয়। অহেতুক কিছু লোক বাইরে বের হচ্ছে। তারা যে মিথ্যা বলে বের হচ্ছে সেটা অবশ্য পরে স্বীকারও করে। অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে। দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে সার্বিকভাবে রাঙামাটির অবস্থা এখনো সন্তোষজনক।’
মোঃ ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত রাঙামাটি নিরাপদ। তবে রাত দিন লোকজনদের সচেতন করতে গিয়ে যে কাজ করছি তাতে এতটুকুই ক্লান্তি নেই। ভালই লাগছে। পরিবারের লোকজন আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন। তাদেরকেও বুঝায় আমরা নিরাপদে আছি। এলাকায় এলাকায় কাজ করতে গিয়ে পৌরসভার কাউন্সিলর ও এলাকার মুরব্বীরাও যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন। লোকজন প্রথমে বিষয়টা আমলে নেয়নি। আমরা লোকজনদের বুঝানোর চেষ্টা করছি। তবে দিন যত যাচ্ছে তত লোকজনের মাঝে সচেতনতা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে রাঙামাটি সুরক্ষা থাকবে বলে মনে করি।’
আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সার্বিকভাবে রাঙামাটির পরিস্থিতি ভাল। জেরার বাইরে থেকেও লোকজন আসছে। অনেকেই বিপদে পড়ে আসছেন-যেমন চাকরি চলে গেছে, খেতে পারছেন না। তাদেরকেও আমরা হোমকোয়ারেন্টাইনে রাখছি। এক্ষেত্রে অবশ্য এলাকার লোকজনও যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন। বৃহস্পতিবার কাউখালীর প্রবেশমূখ গাবতলীতে ছয়জন গার্মেন্টসকর্মীকে পেয়েছিলাম; তারা চট্টগ্রাম থেকে ফিরছে। ঘাগড়া ইউপি চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় তাদেরকে ঘাগড়া কলেজে রাখছি। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তাও দিয়েছি। ফোনেও যোগাযোগ রাখছি। আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করছি। লোকজন সচেতন হলে আশা করি রাঙামাটি নিরাপদ থাকবে।’
শানজীদা মুস্তারী বলেন, ‘সকাল বিকাল আমরা মাঠে কাজ করছি। ভ্রাম্যমান আদালতের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। অন্যান্য জেলার সাথে তুলনা করলে রাঙামাটির সার্বিক পরিস্থিতি ভাল। আশা করি ভবিষ্যতেও রাঙামাটি পরিস্থিতি স্বাভাবিকই থাকবে।’
লাইলাতুল হোসেন বলেন, ‘আমরা যখন গ্রামাঞ্চলের দিকে যায় তখন দেখি লোকজন খুব কম বের হয়। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের লোকজন। তারা মাস্কও ব্যবহার করে। তবে ঘনবসতি এলাকায় লোকজন বের হয় ঠিক কিন্তু আমাদের দেখলেই ঘরে ঢুকে যায়। সমতলের সাথে তুলনা করলে রাঙামাটির সার্বিক পরিস্থিতি ভালই।’
মোঃ বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, ‘সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত আমাদের টিম নিয়ে বিভিন্ন অলি-গলিতে চষে বেড়াচ্ছি। রাঙামাটি পার্কের নিচে একদল ছেলে আড্ডা দিত। খবর পেয়ে গত সপ্তাহে সেখান থেকে আড্ডারত একদল ছেলেকে ধরে এনে বুঝালাম। করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে তারা বুঝেইনা। পরে তারাও স্বীকার করে বলে যে, তাদের ভুল হয়েছে। সেখানে এখন আর আড্ডা হয়না। লেকে পানি শুকিয়ে যাওয়াতে লেকের পাড়ে আড্ডা বেশি হচ্ছে। সেখানেও নজর রাখছি। নৌকা নিয়ে একদল ছেলে অহেতুক লেকে ঘুরতে বের হয়। আমরাও বোট নিয়ে তাদের ধরে এনে শহীদ আবদুস শুক্কুর মাঠে দাঁড় করায়। বুঝানোর পরে তারাও স্বীকার করে যে তারা ভুল করেছে। আড্ডাস্থল গুলো টার্গেট করে অভিযান করছি। এখন অনেক আড্ডা বন্ধ হয়েছে। লোকজন যে সচেতন হচ্ছে এবং বুঝতে পারছে এটাই ভাল লাগে।’
অঞ্জন কুমার দাস বলেন, ‘আমরাতো প্রতিনিয়ত মাঠে আছি। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি। জেলার বাইর থেকে যেসব গাড়ি আসছে সেসব কঠোরভাবে নজরদারি করছি। টহলও জোরদার করছি। ইতোমধ্যে যাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে সবার রিপোর্ট নেগেটিভ। সবাই সচেতন থাকলে রাঙামাটি সুরক্ষা থাকবে।’
নেজারত ডেপুটি কালেক্টর(এনডিসি) উত্তম কুমার দাশ বলেন, ‘ডিসি স্যারের নেতৃত্বে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগনও অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের কাজে এতটুকু ফাঁকি নেই। প্রত্যেকেই এমনভাবে দায়িত্ব পালন করছেন যেন এরা সবাই এই জেলারই সন্তান। যখন যেখানে প্রয়োজন পড়ছে সেখানে ছুঁটে যাচ্ছেন তারা। একদিকে লোকজনদের ঘরে রাখতে পাড়া মহল্লায় ছুঁটে যাচ্ছেন, আবার বাজার নিয়ন্ত্রনেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। শুধু তা-ই নয় অসহায় মানুষগুলোর ঘরে ঘরে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিতেও রাতদিন পরিশ্রম করছেন। মোট কথা রাত নেই দিন নেই যখনই প্রয়োজন তখনই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন সকলে।’
