সকাল বিকাল সন্ধ্যা,ঝুম বৃষ্টি কিংবা গুমোট আবহাওয়া। মেঘলা আকাশ কিংবা তীব্র বারিপাত ঠিকই শংকার ঢেউ ছড়িয়ে দিয়ে গেছে পুরো পার্বত্য এই জেলাজুড়ে। গত এক সপ্তাহ ধরে এমন বৃষ্টি আর কোথাও কোথাও পাহাড়ধসের ঘটনায় ২ জনের মৃত্যু আর সড়কঝুঁকিতে পড়া ছাড়া আর বড় কোন দুর্ঘটনার খবর নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি থাকলেও বড় কোন দুর্যোগ না হওয়ায় আপাত স্বস্তি পার্বত্য জনপদ রাঙামাটিতে।
তবে দুই বছর আগের সেই আগ্রাসি বৃষ্টির সাথে এবার যে জায়গায় স্পষ্ট পার্থক্য সেটা হলো বজ্রপাত ! ২০১৭ সালের ১২ ও ১৩ জুনের তীব্র বৃষ্টির সাথে ছিলো গগণবিদারি বজ্রপাতও। কিন্তু কি আশ্চর্য্য ! এবার কোথায় যেনো উধাও সেই চারপাশ কাঁপানো বজ্রের। সম্ভবত: সেই বজ্রের অনুপস্থিতি আর প্রশাসন ও সাধারনের সতর্কতায় এবার বৃষ্টি একই পরিমাপের থাকলেও নেই পাহাড় ধস কিংবা জীবন শংকা। আবহাওয়া রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের ৮ জুলাই সকাল ৬ টা থেকে ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৩২৪ মিলিমিটার। অপরদিকে দুই বছর আগে ২০১৭ সালের ১২ জুন থেকে পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত ছিলো ৩৪৩ মিলিমিটার। প্রায় কাছাকাছি মাত্রার বৃষ্টিপাত থাকলেও এই বছর কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধসে ২ জন নিহত হওয়া ছাড়া বড় ধরণের কোন ঘটনা নেই। অথচ ২০১৭ সালে নিহত হয়েছিলেন ১২০ জন।
দুই বছরের বৃষ্টিপাতে প্রায় একই চিত্র থাকলেও মৃত্যু বিভিষিকার এই পার্থক্য কেনো জানতে চাইলে ২০১৭ সালের পাহাড় ধসের পর রাঙামাটিতে গবেষনা করতে আসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের সহযোগ অধ্যাপক ইকবাল সারোয়ার জানিয়েছেন, রাঙামাটির গত তিনবছরের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি অনুসরন করলেই বোঝা যায় জলবায় পরিবর্তন কতটা প্রভাব ফেলছে আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর। ২০১৭ সালে পাহাড়ধসের সময় ধারাবাহিক ও ঘন ঘন তীব্র বজ্রপাত,এর কিছুদিন পরে সংঘটিত ভূমিকম্প পাহাড়ধসে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু দুই বছর পরে এসে এবার বৃষ্টিপাত তারচেয়ে বেশি হলেও এবার বজ্রপাত একেবারেই অনুপস্থিত ! শুধু তাই নয়, ২০১৭ সালে জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরু থেকেই তীব্র বৃষ্টিপাত হলেও এবছর পুরো জুনমাসই ছিলো বৃষ্টিহীন। এবার বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে আরো প্রায় একমাস পরে জুলাইতে এসে। পুরো পরিস্থিতিটিই মূলত: জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। তবে আপাতত ধারণা করছি,বজ্রপাত না হওয়ার কারণেই হয়তো পাহাড়ধস ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি।’
এদিকে গত একসপ্তাহের তীব্র ও ধারাবাহিক বৃষ্টির পর শুক্রবার সকাল থেকেই দৃশ্যত বৃষ্টিহীন রাঙামাটি। সারাদিনের স্বস্তি কাটিয়ে শেষ বিকেলে আবার শুরু হয়েছে বৃষ্টি।
রাঙামাটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত শনিবার সকাল ৬টা থেকে রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এই ২৪ ঘন্টায় ৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। রবিবার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এই ২৪ ঘন্টায় ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। সোমবার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এই ২৪ ঘন্টায় ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এই ২৪ ঘন্টায় ৬২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। বুধবার সকাল ছয়টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত এই ২৪ ঘন্টায় ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। তবে বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত মাত্র এই ১২ ঘন্টায় ১৭৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। যা গত ছয়দিনের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত। কিন্তু এর ঠিক একদিন পরেই শুক্রবার পুরোটাই বৃষ্টিহীন রাঙামাটির পর বিকেলে আবারো সেই বৃষ্টি ভয়ের স্রোতধারা নিয়ে ফের নেমে এসেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে রাঙামাটি জেলা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সিনিয়র পর্যবেক্ষক ক্য চিনু মারমা জানিয়েছেন, ‘বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘন্টায় রাঙামাটিতে ১৭৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ জেলায় শনিবার থেকেই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তবে বৃহস্পতিবার সবচে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।’
এদিকে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা রাঙামাটি শহরের মানুষের জন্য ২১ টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এরমধ্যে ৫ টি আশ্রয় নিয়েছে পাঁচ শতাধিক মানুষ। এদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। রাঙামাটি-বান্দরবান,রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ঘাগড়ার কলাবাগান এলাকায় একটি অংশ মাটিধসে ঝুঁকিতে রয়েছে। সওজ, সেনাবাহিনী, ভিডিপি সদস্যরা মাটিভর্তি বস্তা ফেলে সড়কটি রক্ষার চেষ্টা করছে।
আয়তনে দেশের সবচে বড় উপজেলা বাঘাইছড়িতে পানিবন্দী মানুষের জন্য খোলা হয়েছে আরো ১৪ টি আশ্রয়কেন্দ্র। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে ৩২৭ টি পরিবার। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসান হাবিব জিতু জানিয়েছেন, কাচালং নদীর উপচে উপজেলা সদরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করায় মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ায় এসব আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং সবার খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
