দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনের (১৮মার্চ) পর থেকে গত দেড় মাস ধরে অঘোষিতভাবে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার নানিয়ারচর বাজার বয়কট করেছে পাহাড়িরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ‘চাপে’ সাধারণ পাহাড়িরা বাজারে আসছে না।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত কয়েক ধাপে বাজার বয়কট করেছে ইউপিডিএফ। মাঝখানে তাদের সাথে ব্যবসায়ীদের এক প্রকার ‘সমঝোতা’ হলে কিছুদিন বাজারে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ক্রেতারা আসতো। এখন ফের বাজার বয়কটের কারণে উপজেলার নানিয়ারচর সদর, সাবেক্ষ্যং ও বুড়িঘাট ইউনিয়নের পাহাড়ি লোকজন বাজারে না আসায় লোকসানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।
তবে প্রশাসন বলছে, বাজার না মেলায় জনপ্রতিনিধি ও হেডম্যান-কার্বারিদের নিয়ে বসে এ বাজার চালুর বিষয়ে আলোচনা করা হবে। অন্যদিকে ইউপিডিএফের প্রতিপক্ষ সংগঠনগুলো বলছে, জনগণকে জিম্মি করতে ইউপিডিএফ হঠকারী সিদ্ধান্তে বাজার বয়কট কর্মসূচি দিয়েছে। তাদের (ইউপিডিএফ) নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার পাহাড়ি ক্রেতারা হাট-বাজারে এলে তাদের নির্যাতর করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের সাংগঠনিক সম্পাদক রিপন চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ (প্রসিত গ্রুপ) বিভিন্নভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তারা উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে চাপে রেখে বাজারে আসতে দিচ্ছে না। তারা এ ধরণের হঠকারী সিদ্ধান্ত নতুন নয়, এর আগেও ঘটিয়েছে। পিসিপি নেতা রমেল চাকমা মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা এর আগেও বাজার বন্ধ করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের কাছে ১৪ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়ে বাজার খুলে দিয়েছে।’
ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রাধীন এলাকার বেশ কয়েকজন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ব্যক্তি জানান, রাজনৈতিক দলের নেতারা এলাকায় এলাকায় পাহাড়িদের বাজারে যেতে নিষেধ করেছে। তাই অনেকেই বাজারে যায় না ভয়ে। আর কেউ গেলেও তাকে হয়রানির শিকার হতে হয়। তারা আরও বলেন, সাধারণ মানুষ তো বাজারে যেতে চায়। কারণ ঘরে চাল-ডাল থাকলেও তেল-ঔষধ কেনার জন্য হলেও বাজারে যেতে হয়। আমরা কী বলবো? আমাদের যেভাবে বলা হয় বাধ্য হয়ে সব মানতে হয়। তাই অনেকেই নিরূপায় হয়ে মানুষ বাজারে যান না।

একই কথা বলেন ব্যবসায়ী নেতারা। নানিয়ারচর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি ঝিল্লোল মজুমদার বলেন, এ বাজারে প্রায় ২০০ এর অধিক দোকানপাট রয়েছে। উপজেলা নির্বাচনের পর থেকে ইউপিডিএফ অঘোষিতভাবে বাজার বয়কট করে। যার কারণে কম-বেশি বাজারের দোকানিরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেশির ভাগ ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে, বেচাকেনা না থাকায় লেনদেন নিয়েও তাদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে।
উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য ত্রিদিব কান্তি দাশ জানান, উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র দেড়মাস ধরে অঘোষিত ভাবে বাজার বন্ধ রয়েছে। তিনি লোকমুখে শুনেছেন, আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ বাজার বর্জন করেছে। তাই ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রাধীন এলাকার মানুষ বাজারে আসছে না।
নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রগতি চাকমা বলেন, ১৮ মার্চ উপজেলা নির্বাচনের পরদিন ১৯ মার্চ থেকেই ইস্যু ছাড়াই নানিয়ারচর বাজার বয়কট চলছে। নির্বাচন খারাপ-কিংবা ভালো হয়েছে এ ধরণের কোনো মন্তব্য ছাড়াই এতদিন বাজার বন্ধ। আজ (বুধবার) হাট-বাজারের দিনেও এখানে বাজার মেলেনি। তিনি বলেন, লোকমুখে শুনেছি, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ বাজার বয়কট করেছে। কিন্তু ঘিলাছড়িসহ অন্যান্য বাজারে এ ধরণের ঘটনা ঘটেনি।
উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা মিটিং ও উন্নয়ন কমিটির মিটিংয়েও বিষয়টি তোলা হয়েছে। গত পরশু (সোমবার) জেলা প্রশাসক মহোদয় নানিয়ারচরে এসেছেন। উনাকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, বাজার বয়কটের কারণে ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা নেই। অন্যদিকে বাজারে আসতে না পারায় সাধারণ পাহাড়িদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসউদ পারভেজ মজুমদার বলেন, উপজেলা নির্বাচনের পর থেকেই বাজারে পাহাড়ি এলাকার ক্রেতারা আসছে না এমন কথা সত্য। আমি বিষয়ে দুই-একদিনের মধ্যে বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কার্বারিদের নিয়ে বসবো। যেভাবে সাধারণ মানুষকে বাজারমুখী করা যায়, সেই চেষ্টা করবো।
এ প্রসঙ্গে প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাই ইউপিডিএফের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
