হাজী মোঃ ফয়েজুল আজিম। সংক্ষেপে হাজী ফয়েজ নামেই পরিচিত সবার কাছে। রাঙামাটির গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা লংগদুর রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি নাম। জেলা ও উপজেলার বিএনপি রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন তিনি দীর্ঘদিন। উপজেলার ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাইনীমুখ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল অবধি। এরপর ৫ বছর বিরতি দিয়ে ২০০৯ সালে তৃতীয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন চেয়ারম্যান পদে। দল প্রার্থী না দেয়ায় স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছিলেন এবং পরাজিত হয়েছিলেন দলীয় প্রার্থীর কাছেই। হেরে গেলেও জয়ী প্রার্থীর মূল প্রতিদ্বন্ধিকারি ছিলেন তিনিই। পরাজিত জয়েও দমে যাননি তিনি। ২০১৪ সালে ফের আবারো চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চান তিনি চেয়ারম্যান পদে। কিন্তু না পেয়ে আবারো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তিনি। এবারো দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্ধী হয়েই পরাজিত হতে হয় সেই বিএনপির প্রার্থীর কাছেই। কিন্তু সেবার পরাজয়ের আর দলে থাকেননি তিনি। দল ছেড়ে প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মী নিয়ে যোগ দেন আওয়ামীলীগে। কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, আওয়ামীলীগে যোগ দেয়ার পর ২০১৯ সালের অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও পেলেননি চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন। আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে দলটির উপজেলা সভাপতি বারেক সরকারকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। কিন্তু থেকে থাকার পাত্র নন হাজী ফয়েজুল আজিম। ঠিকই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমে গেছেন এই নেতা।
দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রামের কাছে খোলামেলা আলোচনায় বলেছেন নিজের প্রাপ্তি,প্রত্যাশা,হতাশা ও লড়াইয়ের কথা।
তিনি বলেন, ‘বিএনপি করেছি,কিন্তু দল মূল্যায়ন করেনি। বারবার কথা দিয়েও নেতারা কথা রাখেনি। কিন্তু দুইবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছি। তাই ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামীলীগে যোগ দেই। সেই সময় প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মী নিয়ে যোগ দিয়েছিলাম,যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশন চ্যানেলে দেখানো হয়েছিলো। সেই যোগদানের প্রভাবও পড়েছে লংগদুর রাজনীতিতে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লংগদুর ভোটের হিসাবেও আছে তার প্রতিফলন।’
হাজী ফয়েজ বলেন, দল আমাকে প্রার্থী দেয়নি ঠিক,কিন্তু যেহেতু দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যেকেউ নির্বাচন করতে পারবে এবং বিজয়ী সবাই হবে দলের,তাই আমি এবারও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছি। আমার বিশ্বাস আমি এবার বিজয়ী হবো।’
দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ বিএনপিতে দলীয় মনোনয়ন পাইনি, আওয়ামীলীগে এসেও পেলাম না। কিন্তু এই জন্য আমার কষ্ট আছে,হতাশা আছে কিন্তু কারো প্রতি রাগ বা অভিমান নেই। লংগদুবাসি এবার ভোট দিয়ে আমাকে বিজয়ী করে এই অবহেলার প্রতিশোধ নেবে।’
হাজী ফয়েজ বলেন, আমাকে জেলা আওয়ামীলীগের নেতারা কথা দিয়েছিলেন দলীয় মনোনয়ন দেবেন। কিন্তু তারা যেকোন কারণেই হোক কথা রাখেননি বা পারেননি। আমি দাদা ( দীপংকর তালুকদার) এর সাথে দেখা করেছি। তিনি আমাকে স্থানীয় নানান সমস্যার কথা বলেছেন। আমি তাকে শ্রদ্ধা করি,দলকেও। তাই এই বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই,দল বা দাদার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগও নেই।’
দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে সেই বারেক সরকার প্রসঙ্গে হাজী ফয়েজুল আজিম বলেন, ‘বারেক সরকার বিগত নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন এবং গত ইউপি নির্বাচনের সময় যখন তিনি প্রার্থী হন,তখন আমাকে বলেছিলেন আমাকেই উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হবে। কিন্তু ওনি নিজের সেই কথা রাখেননি।’ তিনিতো উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, মাইনী ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান,উনিই আবার উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হচ্ছেন। সব যদি ওনারই লাগে তবে বাকিরা কোথায় যাবে ?’
হাজী ফয়েজুল আজিম বলেন, লংগদু থেকে যারা আওয়ামীলীগের প্রার্থী হতে চেয়েছে তারা সবাই নৈতিকভাবে আমাকে সমর্থন দিয়েছে। উপজেলার দলমত নির্বিশেষে সব মানুষ আমাকেই ভোট দেবে বলেই বিশ্বাস আমার।’
ভোটযুদ্ধের নিয়মিত খেলোয়াড় ফয়েজ আরো বলেন, ‘দেখেন, আমার হারানোর কিছু নাই। গত দুইবারও আমি জয়ের কাছাকাছি গিয়েও জিততে পারিনি,তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। আমি বিশ্বাস করি,লংগদুবাসি আমাকে চায়, আমার প্রতি তাদের যে আস্থা আর বিশ্বাস তারই মূল্যায়ন দেখবেন আপনারা এবারের নির্বাচনের ফলাফলে। ইনশাল্লাহ্, আমি বিজয়ী হয়ে লংগদুবাসির সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে পারব।’
তবে হাজী ফয়েজুল আজিমের কথাই নয়,লংগদুরবাসি বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে কথা বলেও বোঝা গেলো, গত দুইবারের মতো এবারও উপজেলা চেয়ারম্যান পদের শক্ত প্রার্থী হাজী ফয়েজ। তার উপর সেই দুইবার যে তোফাজ্জ্বলের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি,সেই তোফাজ্জ্বলের দল বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় নির্বাচনী মাঠে নেই তিনি। ফলে এবার হাজী ফয়েজ সম্ভাবনার দৌড়ে বেশ এগিয়েই। ধারণা করা হচ্ছে,আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বারেক সরকার আর আওয়ামীলীগের নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হাজী ফয়েজুল আজিমের লড়াই বেশ জমজমাট এবং হাড্ডাহাড্ডিই হবে।
